পৃথিবীর বুকে মানুষের জন্য আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার হচ্ছে কোরআনে কারিম। কোরআন তেলাওয়াত শোনার মানে হলো শ্রেষ্ঠ বাণী শোনা। কোরআনে কারিমের তেলাওয়াত স্বতন্ত্র ইবাদত হিসেবে গণ্য। এর ফজিলত অনেক বেশি। কুরআন তেলাওয়াতের আদব হলো আল্লাহ তা‘আলার জন্য নিয়্যাতকে খালিস করা। কারণ কুরআন তিলাওয়াত একটি মহৎ ইবাদত। কুরআন তেলাওয়াতের আদব সমূহ:

১. পবিত্রতা অর্জন করে কুরআন তিলাওয়াত করা।
২. পবিত্র ও উত্তম পোশাক পরে কুরআন পাঠ করা।
৩. ক্বিবলামুখী হয়ে বসে কুরআন পাঠ করা
৪. কুরআন পাঠের পূর্বে মিসওয়াক করে নেয়া।
৫. পূর্ন মনোযোগের সঙ্গে কুরআন পাঠ করা
৬. কুরআন পাঠের সময় বিনা প্রয়োজনে কারো সঙ্গে কথা না বলা।
৭. কুরআন পাঠের সময় ছাওয়াবের বা কল্যাণের আয়াত পাঠ করলে থামা এবং আল্লাহর কাছে উক্ত ছাওয়াব বা কল্যাণ প্রার্থনা করা। এছাড়া শাস্তির আয়াত পড়লে থামা এবং তা থেকে পানাহ চেয়ে দোয়া করা।
৮. কুরআন কারিম খুলে না রাখা এবং কুরআনের ওপর কোনো কিছু দিয়ে চাপিয়ে না রাখা।
৯. অন্যের কাজের ব্যাঘাত বা সমস্যার সৃষ্টি এমন আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত না করা।
১০. বাজার বা কোলাহল পরিবেশ, যেখানে মানুষ ফাহেশা কথা ও কাজে লিপ্ত সেখানে কুরআন কারিম তিলাওয়াত না করা
১১. কুরআন তিলাওয়াত অবস্থায় হাই উঠলে কুরআন কারিম পাঠ বন্ধ করা।
১২. কুরআন তিলাওয়াতের মাঝে কথা বললে তাউজের সহিত (আউজুবিল্লাহ) বলে পুনরায় কুরআন তিলাওয়াত করা।
১৩. বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্য কুরআন তিলাওয়াতের জন্য অবস্থান নির্ণয় করা। তবে দাঁড়িয়ে, বসে এমনি শুয়েও কুরআন তিলাওয়াত করা যায়।
১৪. কুরআন পাঠের পূর্বে শয়তান থেকে আশ্রয় লাভের দোয়া করা। অর্থাৎ আউজুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাঝিম’ পড়ে নেয়া।
১৫. অতপর বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম পড়া। কারণ, কুরআন তিলাওয়াতের সময় আউজু বিল্লাহ পড়ে গোনাহের পথ বন্ধ করে দিয়ে বিসমিল্লাহ তিলাওয়াতের মাধ্যমে বরকতের জন্য আনুগত্যের দ্বার খুলে নেয়া।
১৬. যেখানে কুরআন তিলাওয়াত হয়, সেখানের শ্রোতাদের উচিত, নিরবে নিশ্চুপ থেকে কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ করা।
১৭. ফজরের সময় তিলাওয়াতের অধিক ফজিলত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

‘যখন কোরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন কান লাগিয়ে শোনো এবং চুপ থেকো।’

এ থেকে প্রতীয়মান হয়, উঁচু স্বরে কোরআন তিলাওয়াত করা বৈধ। যদি কোনো বাধা না থাকে অথবা তিলাওয়াত শোনার প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে, তাহলে উঁচু স্বরে পড়ার বিনিময়ে সওয়াব পাওয়া যাবে।

১৮. অজু ছাড়া তিলাওয়াত জায়েজ আছে; তবে কোরআন স্পর্শ করা জায়েজ নয়।

১৯. কোরআন তিলাওয়াতের জন্য মুখে উচ্চারণ করা শর্ত। তাই মুখে উচ্চারণ না করে কেবল মনে মনে ধ্যান করলে কোরআন পাঠের সওয়াব পাওয়া যায় না। অবশ্য কোরআন দেখা ও স্পর্শ করার সওয়াব পাওয়া যাবে।

২০. ধীরে ধীরে অনুভব করে তিলাওয়াত করা।

২১. কোরআনের অক্ষর-শব্দ-বাক্য শুদ্ধ ও সুন্দরভাবে সুর করে আদায় করা।

২২. ইখলাসের সাথে তিলাওয়াত করা:

লোকের প্রশংসা ও বাহবা কুড়ানোর উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করা যাবে না এবং একে জীবিকা নির্বাহের উপলক্ষণও বানানো যাবে না। রাসূল (স.) বলেন:

তোমরা কোরআন পড় এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা কর; কারণ ভবিষ্যতে এমন এক সমপ্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা কোরআনের দ্বারা দুনিয়ার সুখ অন্বেষণ করবে। পরকালের সুখ কামনা করবে না, (সুনান আহমদ, ১২১২১)।

২৩. পবিত্রতা অর্জন:

এটি আল্লাহ তায়ালার কালামের মর্যাদা প্রদান ও সম্মান প্রদর্শন। অপবিত্র অবস্থায় গোসল না করে কোরআন তিলাওয়াত করা যাবে না। পানি না থাকলে বা অসুস্থতা ও এ জাতীয় কোন কারণে ব্যবহারে অক্ষম হলে তায়াম্মুম করবে।

২৪. খুব আদবের সাথে বিনম্র ও শ্রদ্ধাবনত হয়ে বসা:

শিক্ষক সামনে থাকলে যেভাবে বসত ঠিক সেভাবে বসা। তবে দাঁড়িয়ে শুয়ে এবং বিছানাতেও পড়া জায়েজ আছে।

২৫. সকল সূরার শুরুতে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” পড়া: যদি সূরার মাঝখান থেকে পড়া হয় তাহলে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” পড়ার প্রয়োজন নেই।

২৬. উপস্থিত ও সচেতন মন দিয়ে তিলাওয়াত করা: চিন্তা করবে কি পড়ছে। অর্থ বুঝার চেষ্টা করবে। মন বিনম্র হবে এবং ধ্যান করবে যে মহান আল্লাহ তাকে সম্বোধন করছেন। কেননা, কোরআন আল্লাহরই কালাম।

২৭. তিলাওয়াতের সময় কান্নাকাটি করা: এটি নেককার সালেহীনদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ বলেন-

যারা এর পূর্ব থেকে ইলম প্রাপ্ত হয়েছে- যখন তাদের কাছে এর তিলাওয়াত করা হয় তখন তারা নতমস্তক সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। এবং বলে: আমাদের পালনকর্তা পবিত্র, মহান। নি:সন্দেহে আমাদের পালনকর্তার ওয়াদা অবশ্যই পূর্ণ হবে। তারা ক্রন্দন করতে করতে নতমস্তকে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয় ভাব আরো বৃদ্ধি পায়, (সূরা ইসরা, ১০৭-১০৯)।

২৮. নিয়ত শুদ্ধ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের ওপর আগুনের শাস্তি কঠোর করা হবে বলে জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ওই কারি, যিনি ইখলাসের সঙ্গে কোরআন তিলাওয়াত করতেন না। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৮২; সহিহ ইবন হিব্বান, হাদিস : ৪০৮)

২৯. রাতে ঘুম পেলে বা ঝিমুনি এলে তিলাওয়াত থেকে বিরত থাকা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন,

‘যখন তোমাদের কেউ রাতে নামাজ পড়ে, ফলে তার জিহ্বায় কোরআন এমনভাবে জড়িয়ে আসে যে সে কী পড়ছে তা টের পায় না, তাহলে সে যেন শুয়ে পড়ে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৮৭২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৮২১৪)

অর্থাৎ তার উচিত এমতাবস্থায় নামাজ না পড়ে বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়া, যাতে তার মুখে কোরআন ও অন্য কোনো শব্দের মিশ্রণ না ঘটে এবং কোরআনের আয়াত এলোমেলো হয়ে না যায়।

৩০. ফজিলতপূর্ণ সুরাগুলো ভালোভাবে শিক্ষা করা এবং সেগুলো বেশি বেশি তিলাওয়াত করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,

‘তোমাদের কেউ কি রাত্রিকালে কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ তিলাওয়াতে অক্ষম? তারা বলল, কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ কিভাবে পড়া যাবে! তিনি বলেন, ‘সুরা ইখলাস কোরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৯২২; বুখারি, হাদিস : ৫০১৫)

৩১. ধৈর্য নিয়ে কোরআন তিলাওয়াত করা। যিনি অনায়াসে কোরআন পড়তে পারেন না, তিনি আটকে আটকে ধৈর্যসহ পড়বেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,

‘কোরআন পাঠে যে অভিজ্ঞ ব্যক্তি কোরআন তিলাওয়াত করে, সে সম্মানিত রাসুল ও পুণ্যাত্মা ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকবে। আর যে ব্যক্তি তোতলাতে তোতলাতে সক্লেশে কোরআন তিলাওয়াত করবে, তার জন্য দ্বিগুণ নেকি লেখা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৯৩৭; মুসলিম, হাদিস : ১৮৯৮)

৩২. তিলাওয়াতের সময় সিজদার আয়াত এলে সিজদা দেওয়া। সিজদার নিয়ম হলো, তাকবির দিয়ে সিজদায় চলে যাওয়া।

সংগৃহীত