- আল্লাহর রাজত্ব ও মহত্ত্ব: মহাবিশ্বের একচ্ছত্র অধিপতি একমাত্র আল্লাহ এবং তিনিই জীবন ও মৃত্যুর স্রষ্টা।
- সৃষ্টির নিখুঁত গঠন: আকাশমণ্ডলী ও মানুষের সৃষ্টিতে কোনো ত্রুটি নেই, তা নিয়ে চিন্তার আহ্বান।
- পরীক্ষাগার দুনিয়া: জীবন ও মরণ মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য, কে সবচেয়ে ভালো কাজ করে তা দেখার জন্য।
- জাহান্নামের শাস্তি ও সতর্কবার্তা: অবাধ্যদের জন্য জাহান্নামের ভয়াবহ আজাবের বর্ণনা।
- আল্লাহর জ্ঞান ও কুদরত: তিনি গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানেন।
সুরা মুলক এর ছয়টি ভাগ:
- প্রথম ভাগ ১ থেকে ৪ আয়াত—এ অংশে আছে আল্লাহর ক্ষমতার বর্ণনা।
- দ্বিতীয় ভাগ ৫ থেকে ১৫ আয়াত—এ অংশে জাহান্নাম ও জান্নাতের প্রসঙ্গ।
- তৃতীয় ভাগ ১৬ থেকে ২২ আয়াত—এখানে আছে অত্যাসন্ন বিপদের বার্তা।
- চতুর্থ ভাগ ২৩ থেকে ২৪ আয়াত—সে বিপদে প্রস্তুতির সময় নিয়ে প্রশ্ন।
- পঞ্চম ভাগ ২৫ থেকে ২৭ আয়াত—সে বিপদ কবে ঘটবে, তা নিয়ে মানুষের কৌতূহল?
- শেষ ভাগ ২৮ থেকে ৩০ আয়াত—আল্লাহর বিপরীতে মানুষের দুর্বলতা।
নামকরণ:
প্রথম আয়াতের ‘আল-মুলক’ (الملك) শব্দ থেকে এই সুরার নাম রাখা হয়েছে, যার অর্থ ‘সার্বভৌম কর্তৃত্ব’ বা ‘রাজত্ব’।সুরাটির নামের মধ্যেই এর বিষয়বস্তু ও মর্মার্থ সুস্পষ্ট হয়েছে। আরবি মুলক মানে সার্বভৌমত্ব। আসমান ও জমিনে সার্বভৌমত্বের একমাত্র অধিকারী যে আল্লাহ, তা এ সুরায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সুরাটির শুরুতেই আল্লাহ তাঁর পরম সার্বভৌম কর্তৃত্বের কথা ঘোষণা করেছেন।
দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য যে কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম। তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।’ এতে বোঝা যায়, জীবনের মতো মৃত্যুও স্বতন্ত্র একটি সৃষ্টি।
এ আয়াত থেকে আরও স্পষ্ট বোঝা যায় যে যিনি মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন, তিনি অবশ্যই মৃত্যু থেকে মুক্ত। অর্থাৎ মৃত্যু তাঁর ওপর কার্যকর হতে পারে না।
৩ ও ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাত আকাশ সৃষ্টি করেছেন। করুণাময় আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখো, কোনো ত্রুটি দেখতে পাও কি না। তারপর তুমি বারবার তাকাও, তোমার দৃষ্টি ব্যর্থ ও ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসবে।’ এখানে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিতে কোনো খুঁত বা অসংগতি আছে কি না, তা বারবার খুঁজে দেখতে বলেছেন।
কারণ, প্রথমবার মানুষ যখন অবাক হয়ে কোনো কিছু দেখে, তখন কোনো ত্রুটি বা অসংগতি তার চোখে পড়ে না। বারবার অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে আল্লাহ সৃষ্টির অসংগতি খুঁজে দেখার আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। নিটোল সৃষ্টির কোনো অসংগতি না দেখতে পেয়ে মানুষের দৃষ্টি ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসবে।
এরপর পঞ্চম আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমি নিম্নতম আকাশকে প্রদীপমালায় সুশোভিত করেছি এবং তাদের ক্ষেপণীয় বস্তু করেছি শয়তানের ওপর নিক্ষেপ করার জন্য। আর আমি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।’ এ আসমানকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করা হয়েছে, তেমনি এগুলোকে আক্রমণের মাধ্যমও করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর এই সৃষ্টির মধ্যে কোমলতা ও কঠোরতা পাশাপাশি রয়েছে।
১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে প্রশস্ত করেছেন, অতএব তোমরা দিগ্দিগন্তে বিচরণ ও তাঁর দেওয়া জীবনের উপকরণ থেকে আহার করো। পুনরুত্থানের পর তাঁরই কাছে ফিরতে হবে।
সুরা মুলক এর বিষয়বস্তু
সুরাটিতে বলা হয়েছে, বিশ্বজগতের কর্তৃত্ব ও রাজত্ব সবই আল্লাহর। আরও বলা হয়েছে বিশ্বজগৎ সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সৃষ্টিজগতের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত।
সুরাটিতে আছে তারকারাজি সৃষ্টির রহস্যের কথা, কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসীদের অবস্থা এবং তাদের চিন্তা ও গবেষণা করার দাওয়াত এবং বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগানোর আহবান।
সূরা মূলক এর বাংলা অর্থ
সূরা মূলক বাংলা উচ্চারণ সহ অর্থ (আয়াত ১-১০)
(১) বরকতময় তিনি যার হাতে সর্বময় কর্তৃত। আর তিনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।
(২) যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদের পরিক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। আর তিনি মহাপরাক্রমশালি, অতিশয় ক্ষমাশীল।
(৩) যিনি সাত আসমান স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে তুমি কোনো অসামঞ্জস্য দেখতে পাবে না। তুমি আবার দৃষ্টি ফিরাও, কোনো ত্রুটি দেখতে পাও কি?
(৪) অতঃপর তুমি দৃষ্টি ফিরাও একের পর এক, সেই দৃষ্টি অবনমিত ও ক্লান্ত হয়ে তোমার দিকে ফিরে আসবে।
(৫) আমি নিকটবর্তী আসমানকে প্রদীপ দ্বারা সুশোভিত করেছি এবং সেগুলোকে শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপের বস্তু বানিয়েছি। আর তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের আজাব।
(৬) আর যারা তাদের রবকে অস্বীকার করে, তাদের জন্য রয়েছে যাহান্নামের আজাব। আর কতই না নিকৃষ্ট সেই প্রত্যাবর্তনস্থল!
(৭) যখন তাদের তাতে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা তার বিকট শব্দ শুনতে পাবে। আর তা উথলিয়ে উঠবে।
(৮) ক্রোধে তা ছিন্ন ভিন্ন হওয়ার উপক্রম হবে। যখনই তাতে কোনো দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তার প্রহরিরা তাদের জিজ্ঞাসা করবে, ‘তোমাদের নিকট কি কোনো সতর্ককারি আসেনি’?
(৯) তারা বলবে, ‘হ্যা, আমাদের নিকট সতর্ককারি এসেছিল। তখন আমরা (তাদের) মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করেছিলাম এবং বলেছিলাম, ‘আল্লাহ কিছুই নাজিল করেননি। তোমরা তো ঘোর বিভ্রান্তিতে রয়েছ’।
(১০) আর তারা বলবে, ‘যদি আমরা শুনতাম অথবা বুঝতাম, তাহলে আমরা জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসিদের মধ্যে থাকতাম না’।
সূরা মুলক বাংলা অর্থ (আয়াত ১১-২০)
(১১) অতঃপর তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করবে। অতএব, ধ্বংস জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসিদের জন্য।
(১২) নিশ্চয়ই যারা তাদের রবকে না দেখেই ভয় করে তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও বড় প্রতিদান।
(১৩) আর তোমরা তোমাদের কথা গোপন করো অথবা তা প্রকাশ করো, নিশ্চয়ই তিনি অন্তরসমূহে যা আছে সে বিষয়ে সম্যক অবগত।
(১৪) যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি যানেন না? অথচ তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী, পূর্ণ অবহিত।
(১৫) তিনিই তো তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন, কাজেই তোমরা এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ কর এবং তাঁর রিজিক থেকে তোমরা আহার করো। আর তাঁর নিকটই পুনরুত্থান।
(১৬) যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদেরসহ জমিন ধসিয়ে দেওয়া থেকে কি তোমরা নিরাপদ হয়ে গেছ, অতঃপর আকস্মিকভাবে তা থর থর করে কাঁপতে থাকবে।
(১৭) যিনি আসমানে আছেন, তিনি তোমাদের ওপর পাথর নিক্ষেপকারি ঝোড়ো হাওয়া পাঠানো থেকে তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ, তখন তোমরা যানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্কবাণী?
(১৮) আর অবশ্যই তাদের পূর্ববর্তীরাও অস্বীকার করেছিল। ফলে কেমন ছিল আমার প্রত্যাখ্যান (এর শাস্তি)?
(১৯) তারা কি লক্ষ্য করেনি তাদের উপরস্থ পাখিদের প্রতি, যারা ডানা বিস্তার করে ও গুটিয়ে নেয়? পরম করুণাময় ছাড়া অন্য কেউ এদের স্থির রাখে না। নিশ্চয়ই তিনি সব কিছুর সম্যক দ্রষ্টা।
(২০) পরম করুণাময় ছাড়া তোমাদের কি আর কোনো সৈন্য আছে, যারা তোমাদের সাহায্য করবে? কাফিররা শুধু তো ধোঁকায় নিপতিত।
সুরা মুলক বাংলা অর্থ ( আয়াত ২১-৩০)
(২১) অথবা এমন কে আছে, যে তোমাদের রিজিক দান করবে যদি আল্লাহ তাঁর রিজিক বন্ধ করে দেন? বরং তারা অহমিকা ও অনীহায় নিমজ্জিত হয়ে আছে।
(২২) যে ব্যক্তি উপুড় হয়ে মুখের ওপর ভর দিয়ে চলে সে কি অধিক হেদায়াতপ্রাপ্ত না কি সেই ব্যক্তি যে সোজা হয়ে সরল পথে চলে?
(২৩) বলো, ‘তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি এবং অন্তকরণসমুহ দিয়েছেন। তোমরা খুব অল্পই শোকর করো’।
(২৪) বলো, ‘তিনিই তোমাদের জমিনে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর কাছেই তোমাদের সমবেত করা হবে’।
(২৫) আর তারা বলে, ‘সে ওয়াদা কখন বাস্তবায়িত হবে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।
(২৬) বলো, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহরই নিকট। আর আমি তো স্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র’।
(২৭) অতঃপর তারা যখন তা আসন্ন দেখতে পাবে, তখন কাফিরদের চেহারা মলিন হয়ে যাবে এবং বলা হবে, ‘এটাই হলো তা, যা তোমরা দাবি করছিলে’।
(২৮) বলো, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কি’? যদি আল্লাহ আমাকে এবং আমার সঙ্গে যারা আছে, তাদের ধ্বংস করে দেন অথবা আমাদের প্রতি দয়া করেন, তাহলে কাফিরদের যন্ত্রণাদায়ক থেকে কে রক্ষা করবে’?
(২৯) বলো, ‘তিনিই পরম করুণাময়। আমরা তাঁর প্রতি ইমান এনেছি এবং তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করেছি। কাজেই তোমরা অচিরেই যানতে পারবে কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে’?
(৩০) বলো, ‘তোমরা ভেবে দেখেছ কী, যদি তোমাদের পানি ভূগর্ভে চলে যায়, তাহলে কে তোমাদের বহমান পানি এনে দিবে’?
সূরা আল-মুলকের ফজিলত
সূরা মুলক এর ফজিলত সম্পর্কে বহু সহিহ হাদিসে উল্লেখ আছে, যা এই সূরাটিকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী করে। এর পাঠ শুধু দুনিয়ার উপকারই দেয় না, বরং কবরের আজাব থেকে রক্ষা এবং পরকালে সুপারিশকারী হিসেবেও ভূমিকা রাখে। মহানবী (সা.) বলেছেন
“সূরা তাবারাক (মুলক) পাঠকারীকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করবে।”
আরও একটি হাদিসে আছে “এই সূরা তার পাঠকের জন্য কিয়ামতের দিনে আলোর মতো পথ দেখাবে।”
১. কবরের আজাব থেকে সুরক্ষা: প্রতিদিন রাতে এ সুরা পাঠ করলে কবরের আজাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
২. সুপারিশকারী: এটি পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে, যতক্ষণ না সে ক্ষমা পায়।
৩. জান্নাত লাভ: এটি পাঠকারীকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।
৪. নবী (সা.)-এর সুন্নাত: রাসুলুল্লাহ (সা.) আলিফ লাম মীম সাজদা ও সূরা মুলক না পড়ে ঘুমাতেন না
সুরা মুলক পাঠের ফজিলত সীমাহীন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘কোরআনে এমন একটি সুরা আছে, যার আয়াত ৩০টি। এই সুরা যে পাঠ করবে, সেই ব্যক্তির জন্য সুরাটি সুপারিশ করবে এবং তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সুরাটি হলো তাবারাকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুলকু (সুরা মুলক)। (সুনানে আত-তিরমিজি, ২৮৯১)
প্রতি রাতের যেকোনো সময় সুরা মুলক তিলাওয়াত করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। তিরমিজি শরিফের ২,৮৯২ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুরা আস-সাজদা ও সুরা মুলক তিলাওয়াত না করে কোনো দিন ঘুমাতেন না।
সূরা মুলক নিয়মিত পড়লে মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি জন্মায়, নেক আমলের প্রতি আগ্রহ বাড়ে, দুনিয়ার পরীক্ষায় ধৈর্য ধরে থাকার শক্তি আসে এবং জীবনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়।
ফজিলতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এই সূরা মানুষের চিন্তা-ভাবনাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়। এটি শয়তানের ফাঁদ থেকে রক্ষা করে এবং পাপকাজ থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করে। সূরা মুলকের ফজিলত শুধু আখিরাতেই নয়, দুনিয়ার জীবনেও প্রতিফলিত হয়। নিয়মিত পাঠকারী ব্যক্তি মানসিক শান্তি, স্থিরতা এবং আত্মিক প্রশান্তি অর্জন করে।
প্রতিদিনের আমলে সূরা মুলক
সূরা মুলক প্রতিদিনের রুটিনে যুক্ত করা অত্যন্ত সহজ এবং উপকারী একটি আমল। অনেক আলেম বলেন রাতের বেলায় ঘুমানোর আগে এই সূরা পড়া সুন্নত। তবে দিনের যেকোনো সময়ও এটি পড়া বৈধ এবং সওয়াবের কাজ। প্রতিদিন পড়ার উপকার হলো এটি মানুষের আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে, পাপ থেকে দূরে রাখে এবং পরকালের জবাবদিহিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন একজন ব্যক্তি প্রতিদিন সূরা মুলক তিলাওয়াত করে, তখন তার হৃদয় নরম হয়, মন শান্ত হয় এবং ঈমান বৃদ্ধি পায়। দৈনন্দিন জীবনে সূরা মুলক পাঠকে অভ্যাসে পরিণত করতে চাইলে নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা ভালো। যেমন নামাজের পরে, ঘুমানোর আগে বা ফজরের পর কয়েক মিনিট সময় বের করলেই যথেষ্ট। প্রতিদিনের আমলে এটি যুক্ত রাখলে কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়, যা একজন মুসলিমের আত্মিক জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ হাদিস অনুযায়ী ফজিলত
হাদিসে উল্লেখ আছে যে সূরা মুলক তার পাঠকের জন্য কবরের আজাব থেকে রক্ষাকারী হবে। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন:
“তাবারাকাল্লাজি বিয়াদিহিল মুলক” এটি ৩০ আয়াত বিশিষ্ট একটি সূরা, যা তার তিলাওয়াতকারীকে কিয়ামতের দিনে সুপারিশ করবে এবং তাকে ক্ষমা করিয়ে দেবে।”
অন্য একটি হাদিসে উল্লেখ আছে “এই সূরা কবরের আজাব থেকে রক্ষা করে।” অর্থাৎ কিয়ামত ও কবরের ভয়াবহ যন্ত্রণার সময় সূরা মুলক একজন মুমিনের জন্য ঢালস্বরূপ কাজ করবে।
মানসিক উপকারিতা
সূরা মুলক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলে। নিয়মিত তিলাওয়াত করলে দুশ্চিন্তা কমে, হৃদয় প্রশান্ত হয় এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। এই সূরা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, দুনিয়ার সমস্যাগুলো সাময়িক এবং আল্লাহই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণকারী। এটি মানসিক শক্তি বাড়ায়। মানুষ পাপ থেকে দূরে থাকে, নেক আমলের প্রতি আগ্রহী হয় এবং জীবনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়। সূরাটি পড়তে পড়তে মুমিন ব্যক্তি উপলব্ধি করে আল্লাহর সান্নিধ্যই প্রকৃত শান্তি। আরেকটি উপকার হলো এই সূরা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে। মানসিক অশান্তি, ভয়-ভীতি, হতাশার মুহূর্ত এসব নিয়ন্ত্রণ করতে সূরা মুলকের নিয়মিত তিলাওয়াত অত্যন্ত কার্যকর। সব মিলিয়ে সূরা মুলক মানসিক শক্তি, আত্মিক প্রশান্তি এবং ঈমানি দৃঢ়তা সবকিছুই বৃদ্ধি করে।
সূরা মুলক পাঠের নিয়ম ও দোয়া
এই সূরা মুলক পাঠের কোনো কঠোর নিয়ম নেই, তবে কিছু আদব ও সুন্নত অনুসরণ করলে তিলাওয়াত আরও সুন্দর হয়। পরিষ্কার অবস্থায় থাকা, কিবলামুখী হওয়া এবং মনোযোগ নিয়ে পড়া এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা আরবি ভালো জানেন না, তারা বাংলা উচ্চারণ দেখে পড়তে পারেন, পরে ধীরে ধীরে আরবি শেখা উচিত। তিলাওয়াতের সময় পাঠক আল্লাহর অর্থ ও মর্ম উপলব্ধি করার চেষ্টা করলে উপকার অনেক বেশি হয়। সূরার পরে দোয়া করা হলে আল্লাহর রহমত লাভের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
পাঠের সময় ও পদ্ধতি
সূরা মুলক পড়ার উত্তম সময় হলো রাত, বিশেষ করে ঘুমানোর আগে। হাদিসে উল্লেখ আছে যে নবী মুহাম্মদ (সা.) প্রতিরাতে এটি পড়তেন। তাই এটি সুন্নত আমলের অন্তর্ভুক্ত।
পড়ার আগে অজু করা, পরিষ্কার স্থানে বসা এবং মনোযোগ নিয়ে তেলাওয়াত করা উত্তম। যারা নতুন শিখছেন, তারা প্রতিদিন কয়েকটি আয়াত পড়ে অনুশীলন করতে পারেন। ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ তিলাওয়াত শেখা সহজ হয়। তিলাওয়াতের সময় প্রতিটি শব্দ পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করার চেষ্টা করা উচিত।
সূরা মুলক সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন: সূরা মুলক কোরআনের কততম সূরা?
উত্তর: সূরা মুলক হলো কোরআনের ৬৭তম সূরা।
প্রশ্ন: সূরা মুলক কোথায় অবতীর্ণ হয়েছে?
উত্তর: সূরা মুলক মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে।
প্রশ্ন: সূরা মুলকে মোট কয়টি আয়াত আছে?
উত্তর: সূরা মুলকে মোট ৩০টি আয়াত রয়েছে।
প্রশ্ন: “আল-মুলক” শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: “আল-মুলক” শব্দের অর্থ হলো রাজত্ব বা সার্বভৌম ক্ষমতা।
প্রশ্ন: সূরা মুলক পড়ার প্রধান ফজিলত কী?
উত্তর: প্রধান ফজিলত হলো এটি কবরের আজাব থেকে রক্ষা করে এবং কিয়ামতের দিন শাফায়াতকারী (সুপারিশকারী) হবে।
প্রশ্ন: রাতে ঘুমানোর আগে কোন সূরা পড়া সুন্নত?
উত্তর: রাতে ঘুমানোর আগে সূরা মুলক পড়া সুন্নত।
প্রশ্ন: সূরা মুলক কেন “বাঁচানোর সূরা” নামে পরিচিত?
উত্তর: হাদিসে এর উল্লেখ থাকার কারণে, এটি কবরের আজাব থেকে রক্ষা করে বলেই “বাঁচানোর সূরা” নামে পরিচিত।
প্রশ্ন: সূরা মুলক পাঠের মাধ্যমে কিসের জ্ঞান লাভ হয়?
উত্তর: সূরা মুলক পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর রাজত্ব, ক্ষমতা, সৃষ্টির নিদর্শন এবং পরকালের জবাবদিহিতার গভীর উপলব্ধি লাভ হয়।
প্রশ্ন: সূরা মুলকের প্রধান বিষয়বস্তু কী?
উত্তর: এর প্রধান বিষয়বস্তু হলো আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা, সৃষ্টির নিখুঁততা এবং মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য।
প্রশ্ন: সূরা মুলক কি শুধু রাতে পড়া যায়?
উত্তর: না, এটি দিনের যেকোনো সময় পড়া বৈধ, তবে রাতে, বিশেষ করে ঘুমানোর আগে পড়া উত্তম ও সুন্নত।
প্রশ্ন: সূরা মুলকের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক উপকারিতা কী?
উত্তর: এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক উপকারিতা হলো এটি দুশ্চিন্তা কমায়, হৃদয় প্রশান্ত করে এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি করে।
প্রশ্ন: সূরা মুলক কি তিলাওয়াতকারীর জন্য ক্ষমা করিয়ে দেবে?
উত্তর: হ্যাঁ, হাদিস অনুযায়ী, এটি তার তিলাওয়াতকারীকে কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে এবং তাকে ক্ষমা করিয়ে দেবে।
প্রশ্ন: সূরা মুলকের প্রথম আয়াতের বাংলা অর্থ কী?
উত্তর: প্রথম আয়াতের অর্থ হলো: “বরকতময় তিনি যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব। আর তিনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।”
প্রশ্ন: কবরের আজাব থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী?
উত্তর: নিয়মিত সূরা মুলক তিলাওয়াত করা কবরের আজাব থেকে রক্ষা পাওয়ার একটি উপায়।
প্রশ্ন: সূরা মুলকের কোন আয়াতে জমিনকে সুগম করার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: ১৫ নং আয়াতে জমিনকে সুগম করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে: “তিনিই তো তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন…”
প্রশ্ন: সূরা মুলকের কোন আয়াতে আল্লাহকে ‘আল-লাতিফুল খাবীর’ বলা হয়েছে?
উত্তর: ১৪ নং আয়াতে আল্লাহকে অতি সূক্ষ্মদর্শী, পূর্ণ অবহিত (আল-লাতিফুল খাবীর) বলা হয়েছে।
প্রশ্ন: সূরা মুলক অনুযায়ী, মানুষ কিসের জন্য সৃষ্টি হয়েছে?
উত্তর: মানুষ সৃষ্টি হয়েছে এই জন্য যে আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম।
প্রশ্ন: জাহান্নামের কাফিরদের কি প্রশ্ন করা হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, জাহান্নামের প্রহরীরা তাদের জিজ্ঞাসা করবে, “তোমাদের নিকট কি কোনো সতর্ককারি আসেনি?”
প্রশ্ন: সূরা মুলক অনুযায়ী, জমিনে মানুষকে কে সমবেত করবেন?
উত্তর: আল্লাহ্ই জমিনে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর কাছেই তাদের সমবেত করা হবে।
প্রশ্ন: সূরা মুলক পাঠের জন্য কি তাজবীদের নিয়ম জানা জরুরি?
উত্তর: হ্যাঁ, তাজবীদের মৌলিক নিয়মগুলো জানলে উচ্চারণ আরও সুন্দর ও শুদ্ধ হয় এবং তিলাওয়াতের সওয়াব বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্ন: কুরআন এ সর্বমোট কতটি সূরা আছে?
উত্তর: কুরআনে মোট ১১৪টি সূরা (অধ্যায়) রয়েছে, যা বিভিন্ন আয়াত বা পঙক্তিতে বিভক্ত এবং এটি মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থের একটি মূল অংশ, যার প্রথম সূরা হলো ‘আল ফাতিহা’ এবং শেষ সূরা হলো ‘আন-নাস’।