আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত অপরিসীম। গুনে শেষ করা যাবে না। বান্দার কর্তব্য হলো, নিয়ামতের শোকর আদায় করা। মুখে এবং কাজের মাধ্যমে।আল্লাহ তায়ালা নিজেই ঘোষণা দিচ্ছেন :
তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামতসমূহ গুনতে শুরু কর, তবে তা গুনে শেষ করতে পারবে না। বস্তুত আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা নাহল : ১৮)।
এই কর্তব্য পালন করলে দয়াময় আল্লাহ নিয়ামত আরও বাড়িয়ে দেবেন। আর কর্তব্যে অবহেলা করলে রয়েছে কঠিন শাস্তি। আল্লাহ তায়ালা বলেন :
যদি তোমরা শোকর কর তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বেশি দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে আমার শাস্তি অবশ্যই কঠোর। (সূরা ইবরাহীম : ০৭)।
আমাদের সন্তান-সন্তুতিও এমন এক মহা নিয়ামত, যা শুধু সে-ই পায়, আল্লাহ যাকে দান করেন। এখানে কারও কোনোরূপ ক্ষমতা চলে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :
আকাশম-লী ও পৃথিবীর রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। অথবা তাদের দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই। আর যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। তিনি নিশ্চয়ই সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। (সূরা শূরা : ৪৯-৫০)।
অতএব সন্তান-সন্তুতিকে মহান আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত জ্ঞান করে শোকর আদায় করতে হবে। স্মরণ রাখতে হবে তাদের ব্যাপারে আমাদের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। এ সম্পর্কে কাল কিয়ামতে আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে। এক দীর্ঘ হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন,
পুরুষ তার পরিবারের জিম্মাদার; পরিবার সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। নারী তার স্বামীর ঘর ও তার সন্তানদের জিম্মাদার; তাদের সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সুনানে আবু দাউদ : ২৯২৮)।
আমাদের কর্তব্য :
আমাদের কর্তব্য হলো, সন্তানের দুনিয়াবি প্রয়োজনগুলো যথাসাধ্য পূরণ করা এবং সে যেন আখেরাতে জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাত লাভের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সফলতা অর্জন করতে পারে, এজন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন :
হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর…। (সূরা তাহরীম : ০৬)।
আমরা অনেকেই সন্তানের অস্থায়ী ভবিষ্যতের সফলতার জন্য তো নানান চেষ্টা ও তদবির করি; কিন্তু তার চিরস্থায়ী সফলতার ব্যাপারে উদাসীন থাকি। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম থেকে রক্ষা এবং জান্নাত লাভের মৌলিক দু’টি উপায় উল্লেখ করেছেন :
আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তারা জান্নাতের অধিবাসী; তারা তাতে চিরকাল থাকবে। (সূরা বাকারা ২ : ৮২)।
এমন আরও অনেক আয়াত রয়েছে যেগুলোর বার্তা হলো, ‘জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণ ও জান্নাত লাভের উপায় ঈমান ও নেক আমল’। অতএব সন্তানকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করতে হলে, তাকে ঈমান ও নেক আমলের ধারক এবং কুফুর, শিরক ও মন্দ কাজ বর্জনকারী বানাতে হবে। এজন্য ছোট থেকেই তার পেছনে পরিকল্পিত মেহনত করতে হবে।
আমাদের করণীয়
সন্তানের জন্য দুয়া করা :
সন্তানকে নেক্কার হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টার সাথে সাথে দুয়াও করতে হবে, আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে নেক্কার বানান। এমন দুয়া কুরআনে কারীমে অনেক রয়েছে। যেমন :
হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্তুতির পক্ষ থেকে আমাদের দান করুন চোখের শীতলতা এবং আমাদের পরহেযগারদের জন্য আদর্শ বানান। (সূরা ফুরকান : ৭৪)।
মারইয়াম (আ.)-এর মায়ের দুয়া :
আমি তাকে (মারয়ামকে) ও তার সন্তান-সন্তুতিকে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আপনার আশ্রয়ে দিচ্ছি। (সূরা আলে ইমরান : ৩৬)।
ইবরাহীম (আ.)-এর দুয়া :
হে আমার রব! আমাকে একজন সৎপুত্র দান করুন। (সূরা সাফফাত : ১০০)।
হে আমার রব! আমাকে নামাজ কায়েমকারী বানান এবং আমার সন্তান-সন্তুতির মধ্য থেকেও (এক দলকে)। হে আমাদের রব! আর আমাদের দুয়া কবুল করুন। (সূরা ইবরাহীম : ৪০)।
আম্বিয়ায়ে কেরাম জানতেন, আল্লাহর কাছে কী চাইতে হয়। কীভাবে চাইতে হয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের দুয়াগুলো পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন আমাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
উত্তম তারবিয়াত পিতা-মাতার উপর সন্তানের হক
যেমন মাতা-পিতার খেদমত, ও সম্মান সন্তানের কর্তব্য তেমনি মাতা-পিতারও সন্তানের হকসমূহ আদায় করা কর্তব্য। এজন্যই জানা উচিত, তাদের উপর সন্তানের কী কী হক ও দায়-দায়িত্ব রয়েছে এবং সন্তানের সাথে তাদের আচার-ব্যবহার কেমন হতে হবে। আর তাদের দ্বীনী তারবিয়াত কীভাবে করতে হবে। মূলত তাদেরকে দ্বীনী তারবিয়াত করা, পিতা-মাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। যে মা-বাবা সন্তানের দ্বীনী তারবিয়াতের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করবেন তারা দুনিয়া-আখেরাত উভয়জগতে কামিয়াব হবেন। আর যে মা-বাবা সন্তানের দ্বীনী তারবিয়াত করবেন না তারা পরকালে জবাবদিহির সম্মুখীন হবেন।
সন্তানের উত্তম শিক্ষাদান পিতা-মাতার উপর ফরয
আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাতা-পিতার উপর সন্তানের উত্তম শিক্ষাদান আবশ্যক করে দিয়েছেন। আর যে বিষয় অবশ্য-পালনীয় তাতে কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছার এখতিয়ার থাকে না। হাঁ, নফল বা মুস্তাহাব কাজে সে এখতিয়ার থাকে। ফরয বা ওয়াজিব আদায় না করলে জবাবদিহি করতে হয়।
হযরত সাহবান মাহমুদ রাহ. স্বীয় কিতাব ‘তারবিয়াতে আওলাদ’-এর কারণ উল্লেখ করেন যে, সন্তানের উত্তম শিক্ষা-দীক্ষা, আচার ব্যবহার ইত্যাদি তার বাল্যকাল থেকেই শুরু হয়ে যায়। সন্তান ভুমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই আল্লাহ এবং তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে পিতা-মাতার উপর এই হুকুম বর্তায় যে, তাকে উত্তম তারবিয়াত কর।
এই জন্য পিতা-মাতা যদি সন্তানকে বাল্যকাল থেকেই উত্তম শিক্ষা-দীক্ষা না দেয় এবং সন্তান এভাবেই তরবিয়াতহীনভাবে বেড়ে ওঠে, পরে শরীয়তের মুকাল্লাফ হওয়ার পর তার থেকে গোনাহ প্রকাশ হতে থাকে তাহলে মাতা-পিতার অবহেলাও যেহেতু তার গোনাহে লিপ্ত হওয়ার একটা উপলক্ষ বা কারণ তাই তার ওই গোনাহগার সন্তানের সাথে সাথে মাতা-পিতাও গোনাহগাররূপে গণ্য হবে।
সন্তানের ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখে চুপ থাকা
উদাহরণ স্বরূপ নাবালেগ সন্তান বালেগ হওয়ার পরও নামায পড়ে না। রোযা রাখে না, যাকাত দেয় না, মেয়েরা পর্দা করে না। সবাই স্বেচ্ছাচারিতার সাথে জীবন-যাপন করে, আর মা-বাবা বসে বসে তা দেখে, কিছুই বলে না। বরং মাঝে মাঝে বলে যে, আমরা তো আমাদের দায়িত্ব পালন করে দিয়েছি। মনে রাখবেন, প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করিনি। বরং আমরা আমাদের দায়িত্বে অনেক অবহেলা করেছি, করছি এবং করেই চলছি। যার ফলে দিন দিন আমাদের গোনাহের কুফল বেড়েই চলেছে।
মা-বাবা যদি দুনিয়া থেকে চলে যায় আর সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং গোনাহে লিপ্ত থাকে তাহলেও মা-বাবা -যদি দায়িত্বে অবহেলা করে থাকেন- তাদের দায়িত্বে অবহেলা করার কারণে এর কিছু দায়ভার তাদের উপরও বর্তাবে।
আমাদের সকলেরই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। তিনি আমাদেরকে কেবল এই দায়িত্ব দেননি যে, নিজে শরীয়তের পাবন্দ হব এবং আল্লাহর বিধি-বিধান পালন করব। বরং নিজের পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি এমনকি অধীনস্থদেরসহ সবার জিম্মাদারী আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর দিয়েছেন।
উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলছেন, তোমরা নিজে জাহান্নাম থেকে বাঁচো এবং পরিবারকে বাঁচাও। আর এই জাহান্নাম থেকে বাঁচার উপায় হল, সন্তানের প্রতি শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত হকসমূহ পালন করা। আর এই হুকুক সন্তান জন্মলাভের পর থেইে শুরু হয়ে যায়।
সংগৃহীত