আমানত শব্দের অর্থ বিশ্বস্ততা, আস্থা, নিরাপত্তা, আশ্রয়, তত্ত্বাবধান ইত্যাদি। সহজ ভাষায়, কারো কাছে কোনো সম্পদ, অর্থ, বস্তু গচ্ছিত রাখাকে আমানত বলা হয়। আর যিনি গচ্ছিত বস্তু যথাযথভাবে হেফাজত করেন এবং যথাসময়ে ফেরত দেন, তাকে আল-আমিন তথা বিশ্বস্ত আমানতদার বলা হয়।ইসলাম মুসলমানদের আমানতদারিতার প্রতি বিশেষ তাগিদ দেয়। মহান আল্লাহ বলেন,

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে তোমরা যেন প্রাপ্য আমানত প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও…।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)

মুমিনকে অবশ্যই আমানতদার হতে হবে। আমানতদারি মুমিনের বিশেষ গুণ।

পবিত্র কোরআনে মুমিনের গুণাবলি সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকে।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ৮)
ইসলামের দৃষ্টিতে যে ব্যক্তি আমানত রক্ষা করে না সে মুনাফিক বা কপট। হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘চারটি স্বভাব যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সে খাঁটি মুনাফিক এবং যার মধ্যে তার একটি দেখা যাবে তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থাকবে, যে পর্যন্ত না সে তা পরিহার করবে (১) যখন তার কাছে কোনো আমানত রাখা হয় সে তা খেয়ানত করে, (২) যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, (৩) যখন ওয়াদা করে, ভঙ্গ করে এবং (৪) যখন কারো সঙ্গে ঝগড়া- বিবাদ করে, তখন সে অশ্লীলভাষী হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৪)
আমানতদার ব্যক্তির জন্য রাসুল (সা.) নিজেই জান্নাতের জামিনদার হবেন। হাদিসে এসেছে, উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘তোমরা নিজেদের পক্ষ থেকে আমাকে ছয়টি বিষয়ের জামানত দাও, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জামিনদার হব। ১. তোমরা যখন কথা বলো, তখন সত্য বলো; ২. যখন ওয়াদা করো, তখন পূর্ণ করো; ৩. যখন তোমাদের কাছে আমানত রাখা হয়, তা আদায় করো; ৪. নিজেদের লজ্জাস্থানকে হেফাজত করো; ৫. নিজ দৃষ্টিকে অবনমিত রাখো এবং ৬. নিজ হাতকে অন্যায় কাজ থেকো বিরত রাখো।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ২২৮০৯) 
ঈমানদার হওয়ার জন্য আমানতদার হওয়া জরুরি। অন্য কথায়, যার আমানতদারি নেই তার ঈমান নেই। আনাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন খুতবা খুব কম দিয়েছেন, যাতে এ কথা বলেননি যে যার আমানতদারি নেই তার ঈমান নেই এবং যার ওয়াদা-অঙ্গীকারের মূল্য নেই তার দ্বিন-ধর্ম নেই। (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ১২৪০৬)

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনন্য গুণ হলো সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা। এ কারণে কাফির, মুশরিকরাও তাঁকে ‘আল আমিন’ বা ‘বিশ্বাসী’ বলে ডাকত। আমানতদারি বা বিশ্বস্ততা মানুষের অনুপম বৈশিষ্ট্য। আমানতদার ব্যক্তি সব সমাজেই প্রশংসিত। আল্লাহ তাআলা প্রকৃত মুমিনের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন,

‘তারা (মুমিনরা) সেসব লোক, যারা আমানতের প্রতি লক্ষ রাখে এবং স্বীয় অঙ্গীকার হেফাজত করে।’ (সুরা-২৩ মুমিনুন, আয়াত: ৮) ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, আমানতসমূহ তার প্রকৃত পাওনাদারদের নিকট প্রত্যর্পণ করতে।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৫৮)

আমানতদারি একটি ব্যাপক বিষয়। সৃষ্টির সূচনায় আল্লাহ তাআলা তাঁর আমানত সোপর্দ করার জন্য আসমান, জমিন, পাহাড় ও মানুষের কাছে প্রস্তাব করেছিলেন।

‘আমরা আকাশ, পৃথিবী ও পর্বতমালার নিকট এই আমানত পেশ করেছিলাম। অতঃপর তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং শঙ্কিত হলো, কিন্তু মানুষ তা বহন করল। বস্তুত সে অতিশয় জালিম ও অজ্ঞ।’ (সুরা-৩৩ আহযাব, আয়াত: ৭২)

ব্যক্তিগত জীবনে একনিষ্ঠতার সঙ্গে ইবাদত করা তথা আল্লাহর আদেশ পালন করা ও নিষেধ থেকে বিরত থাকা, হালাল-হারাম মেনে চলা, লেনদেনে, চালচলনে, কাজেকর্মে আল্লাহর বিধিবিধান মেনে চলা—সবই আমানতদারির বিভিন্ন অংশ। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনেও আমানতদারি রক্ষা করা জরুরি। আমানতদারি রক্ষা না করা মুনাফিকের নিদর্শন। প্রিয় নবীজি (সা.) বলেন,

‘যার মধ্যে এই চার স্বভাব রয়েছে, সে খাঁটি মুনাফিক; আর এর যেকোনো একটি যার মধ্যে রয়েছে, তার মধ্যে মুনাফিকের লক্ষণ বিদ্যমান, যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে। ১. আমানত খিয়ানত করে, ২. মিথ্যা বলে, ৩. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ও ৪. বিবাদে অশ্লীল কথা বলে। (বুখারি: ৩৩)

আমানত ব্যাপক অর্থবোধক একটি বিষয়। এর প্রধান অনুষঙ্গ তিনটি—জীবন, সম্পদ ও সম্মান। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক আমানত, কথার আমানত, গোপনীয়তা রক্ষার আমানত, সম্ভ্রমের আমানত, দায়িত্বের আমানত, ইলমের আমানত, ইসলামি দাওয়াতের আমানত, দ্বীন প্রতিষ্ঠার আমানত, রাষ্ট্রীয় আমানত, আদালতের মাধ্যমে আল্লাহর ন্যায়বিধান বাস্তবায়নের আমানত, নেতৃত্ব ও পদমর্যাদার আমানত, ন্যায়বিচারের আমানত, জনগণের আমানত, সংগঠনের আমানত, প্রতিষ্ঠানের আমানত, চাকরির আমানত, ব্যবসায়ের আমানত, স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের আমানত, পরিবার প্রতিপালনের আমানত ইত্যাদি।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,

‘তুমি তার আমানত আদায় করো, যে তোমার নিকট আমানত রেখেছে। আর তোমার সঙ্গে যে খিয়ানত করেছে, তার সঙ্গে খিয়ানত করো না।’ (আবুদাউদ: ৩৫৩৫; তিরমিজি: ১২৬৪)

আল্লাহ তাআলা বলেন,

‘তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো, নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সুরা-১৭ বনি ইসরাইল, আয়াত: ৩৪)

আল্লাহপ্রদত্ত সব নিয়ামতই বান্দার কাছে আমানত। এসবের হেফাজত করতে হবে, না হয় পরকালে জবাবদিহি করতে হবে। যেমন: জীবন, যৌবন, চক্ষু, কর্ণ, বাক্শক্তি, হস্ত-পদ প্রভৃতি। আল্লাহ তাআলা যে সম্পদ দিয়েছেন, তা দ্বীনের পথে মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে। অন্যথায় তা খিয়ানতরূপে গণ্য হবে।

পবিত্র কোরআনে আমানতের গুরুত্ব :

“নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন (প্রত্যেক) আমানতসমূহ তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার ফয়সালা করবে, তখন ইনসাফভিত্তিক ফয়সালা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে সুন্দর উপদেশ দেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সবকিছু শোনেন এবং দেখেন।” (সূরা নিসা-৫৮)

উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা :
আলোচ্য আয়াত প্রমাণ করে যে, আমানত সংরক্ষণ করা এবং তা যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়া প্রত্যেকের জন্য ওয়াজিব। এই আয়াতে আল্লাহ আমানত সংরক্ষণের নির্দেশ প্রদান করেছেন এজন্য প্রত্যেক মানুষের উপর আমানত সংরক্ষণ করা এবং তা প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছে দেয়া ওয়াজিব। এর বিপরীত করা হারাম ও কবীরা গুনাহ। আমানত রক্ষা করা আখলাকে হামিদাহ-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সচ্চরিত্র ব্যক্তির মধ্যে আমানতদারী বিশেষভাবে বিদ্যমান থাকে। আমানত রক্ষা করা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ।

আমানত সংরক্ষণকারীরা জান্নাতুল ফেরদৌসের ওয়ারীশ হবে :

“আর যারা নিজেদের আমানত ও অঙ্গীকার সমূহ পূর্ণ করে ; যারা নিজেদের নামাজ সমূহ হেফাজত করে; তারাই হবে জান্নাতের ওয়ারিশ; তারা জান্নাতুল ফেরদৌসের ওয়ারিশ হবে এবং সেখানে চিরকাল থাকবে।” (সূরা মুমিনুন : ৮-১১)

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা :
উপরোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে যে, খরিদ করা ব্যতীত উত্তরাধিকার সূত্রে কোন কিছুর মালিক হওয়া কে ওয়া ওয়ারিশ বলা হয়। আলোচ্য আয়াত সমূহ তিনটি গুনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, যাদের মধ্যে এই তিনটি গুণ থাকবে তাদেরকে আল্লাহ তাআলা জান্নাতুলফেরদাউসের ওয়ারিশ বানিয়ে দিবেন। তিনটি গুণ হল :
১. যারা যথাযথভাবে আমানত সংরক্ষণ করে। ২. যারা ওয়াদা ঠিক রাখে। ৩. যারা যথাসময়ে নামাজ আদায় করে।

আমানতের ক্ষেত্রসমূহ :
কারো নিকট কোন দ্রব্য বা জিনিসপত্র রাখা হলে তা অবশ্যই যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। গুচ্ছিত দ্রব্যের কোনরূপ পরিবর্তন করা যাবে না। তা নিজ কাজে ব্যবহার করা যাবে না। বরং প্রকৃত মালিক যখন চাইবে তখন তার ফিরিয়ে দিতে হবে। এটাই আমানতের ইসলামী নীতি ও পদ্ধতি।

আমানতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যাপক। শুধু মানবসম্পদ এই আমানত নয় বরং কথা, কাজ, মান -সম্মান ও আমানত হতে পারে। কেউ বিশ্বাস করে কোন কথা বললে এবং তার গোপন রাখতে বললে সে কথা ও আমানত স্বরুপ। সে কথা অন্যের নিকট বলে ফেললে আমানতের খিয়ানত করা হয়।  ইসলামে মানুষের প্রতিটি দায়িত্ব ও কর্তব্য আমানত স্বরুপ। ব্যক্তিগত কাজের পাশাপাশি মানুষকে আরও বহু দায়িত্ব পালন করতে হয়। মানুষের এসব পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, জাতীয়, আন্তর্জাতিক দায়িত্ব আমানত হিসেবে গণ্য।

আমানতের কতিপয় ক্ষেত্র :
১. মাতা-পিতার নিকট সন্তান আমানত স্বরুপ।
২. সন্তানের নিকট মাতা পিতা আমানত।
৪. ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র আমানত।
৫. কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিকট ঐ প্রতিষ্ঠান আমানত স্বরুপ।
৬. সরকারের নিকট রাষ্ট্রের সকল সম্পদ ও জনগণের অধিকার আমানত স্বরুপ। ৭.জনগণের নিকট রাষ্ট্র আমানত স্বরুপ।

খায়বার যুদ্ধে রাসুলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন ইহুদিদের একটি দুর্গ ঘেরাও করেন। সেখানকার ইহুদি নেতার একজন রাখাল একপাল ছাগল নিয়ে নবীজির কাছে আসেন। রাখালটি ছিলেন ওই ইহুদি নেতার বেতনভুক্ত মজুর। তিনি এসে বললেন ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার সামনে ইসলামকে উপস্থাপন করুন। নবীজি তার সামনে ইসলামকে তুলে ধরেন । তিনি সাথে সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি হলেন হজরত আসলাম আল হাবশী (রা)। যিনি ছিলেন হাবশার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ। ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি বললেন, আমি এই ছাগলগুলোর মালিকের মজুর। আমার নিকট এগুলো তার আমানত। এখন এই ছাগলগুলো আমি কী করব? রাসুলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এগুলোর মুখ কেল্লার দিকে ঘুরিয়ে এবং মুখে একটু আঘাত করে হাঁকিয়ে দাও, তারা মালিকের কাছে ফিরে যাবে। তিনি তাই করে ছাগলগুলোকে হাঁকিয়ে দিয়ে বললেন, তোমরা তোমাদের মালিকের নিকট ফিরে যাও, আল্লাহ তোমাদের সাথে থাকবেন। ছাগলগুলো মালিকের কাছে পৌঁছে গেলেন। তিনি এমন সাহাবী ইমান গ্রহণের সাথে আমানতের গুরুত্ব অনুধাবণ করেছেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে এক ওয়াক্ত সালাত আদায়ের সুযোগও পাননি। শহীদ হয়ে গেছেন। (উসদুল গাবা ১/১০৭)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মানুষের চারিত্রিক গুণাবলির মধ্যে যে গুলো সবচেয়ে আগে অদৃশ্য হয়ে যাবে তা হলো আমানতদারিতা। আর শেষ পর্যন্ত যা রয়ে যাবে তা হলো নামাজ। তবে এমন অনেক নামাজি আছে, যারা কোনো কল্যাণই অর্জন করতে পারেন না। হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলেপাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

তোমরা খিয়ানত করোনা। কেননা খিয়ানত কতই না শাস্তিযোগ্য অপরাধ। (আবু দাউদ) কিয়মতের ময়দানে মানুষের সব আমলনামা পেশ করা হবে। পাপ-পুণ্যের হিসাব করা হবে। পৃথিবীতে যারা আমানতের খিয়ানত করেছিল তাদের পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, কিয়ামতের দিন আমানতের খিয়ানতকারীকে হাজির করা হবে এবং বলা হবে তোমর কাছে গচ্ছিত আমার আমানত ফিরিয়ে দাও। সে বলবে হে আমার প্রতিপালক তা কীভাবে ফিরিয়ে দেব? পৃথিবীতো ধ্বংস হয়ে গেছে। তখন তার গচ্ছিত আমানতগুলো যেভাবে রাখা হয়েছিল ঠিক সেই ভাবে জাহান্নামের সর্বনিম্নস্তরে তাকে দেখানো হবে। অতঃপর তাকে বলা হবে ওইখানে অবতরণ করে এগুলো উত্তোলন করে নিয়ে আস। সে তখন নেমে যাবে জিনিসগুলো ঘাড়ে করে নিয়ে আসতে চাইবে। জিনিসগুলো তার কাছে দুনিয়ার সব পাহাড়ের চাইতেও ভারী মনে হবে। সে মনে করবে এগুলো তুলে আনলে সে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে। সে তখন জাহান্নামের শেষ প্রান্তে চবে আসবে তখই উক্ত জিনিসগুলো জাহান্নামের নিচে পড়ে যাবে। এভাবে সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। (বায়হাকী)

সামাজিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আমানতের চর্চা থাকলে সেই সমাজ কল্যাণে ভরপুর থাকে এবং সর্বত্র শান্তি বিরাজ করে। সমাজের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ তাদের দায়িত্ব যথাথ পালনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার রক্ষা করতে চেষ্টা করে। এতে জনগণও উপকৃত হয়। আল্লাহতায়ালা হজরত ইউছুফ (আ.) সর্ম্পকে বলেন, ইউসুফ বলল, আমাকে দেশের ধনভাণ্ডারে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান। (সুরা ইউসুফ, আয়াত-৫৫) আল্লাহতায়ালা বলেন, চোখের চুরি ও অন্তরের গোপন বিষয় তিনি জানেন। (সুরা মুমিন, আয়াত-১৯) আত্মসাতের পরিমাণ কম হউক বা বেশি হউক সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। খায়বারের যুদ্ধে একজন গোলাম হাঠৎ তীরের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, কতই সৌভাগ্য তার! সে জান্নাতি হয়ে গেল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, কখনো নয়। শপথ যার হাতে আমার প্রাণ। খায়বরে বণ্টন ব্যতীত সে যে কাপড় নিয়েছে, তা তার জন্য আগুন জালাতে থাকবে। (সহিহ বুখারি)

হজরত ইমরান বিন হুসাইন (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার যুগের লোকেরাই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। অতঃপর তাদের নিকটবর্তী যুগের লোকেরা। রাবী বলেন, আমি বলতে পারছিনা নবীজি তার যুগের পর দুই যুগ নাকি তিন যুগের কথা উল্লেখ করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, তোমাদের পর এমন লোকেরা আসবে যারা খেয়ানত করবে, আমানত রক্ষা করবে না। সাক্ষ্য দিতে না ডাকলেও তারা সাক্ষ্য দিবে, তারা মানত করবে কিন্তু তা পূর্ণ করবে না। তাদের মধ্যে মেদওয়ালাদের প্রকাশ ঘটবে। (সহিহ বুখারি-২৬৫১)

দ্বীনের আমানত

দ্বীনের আমানত হল ইসলামের পঞ্চ আরকান আদায় করা। যেমন-  নামাজ, রোযা, যাকাত ইত্যাদি আদায় করা। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন নিশ্চয়ই আমি আকাশ, জমিন ও পর্বতমালার প্রতি এই আমানত পেশ করেছি, অতঃপর তারা তা বহন করতে অস্বীকার করেছে এবং এতে ভীত হয়েছে। আর মানুষ তা বহন করেছে।‘( সূরা আল-আহযাব)

 দায়িত্বের আমানত

এটা সব থেকে গুরত্ব, কারণ এটা হক্কুল ইবাদতের মধ্যে পড়ছে।যখন আপনাকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটা একটি আমানত সেই দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করার মধ্যে কোনো ত্রুটি না থেকে এবং সেটা ভালো ভাবে হেফাজতসহ্ রাখা হলো একটি আমানত। তার মধ্য কোনো ত্রুটি থাকলে অপর ব্যাক্তি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে অতঃপর সে তার নিকট  নিআমানতের খিয়ানত হিসেবে গণ্য হবে এবং তার ওপর রাগোনিত হবে।যদি সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে আমানত বাড়বে অতঃপর লোকজন বেশি ভালোবাসবে।যায় কারণে একজন ন্যায়পরায়ণ সমাজ সেবা ও তাদের কল্যাণের জন্য রত থাকবে।

জিহ্বার আমানত

জিহ্বার রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রত্যেক মানুষের ওপর অপরিহার্য বিশেষ ভাবে মুসলমানদের।কারণ কুরআন শরীফে এবং হাদিসে ইহার ব্যাপারে সতর্ক বা সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। এর প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ‘যে চুপ করে থাকলো সে নাজাত পেল।’ জিব্হা দ্বারা অপরকে আক্রান্ত করি, এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকি এবং কু-শব্দ বলি। জিহ্বার আমানত হলো তাকে হিফাজত করে রাখি এবং অপর ব্যাক্তি যাতে কোনো রকমের কষ্ট না পায়। জিহ্বাকে গীবত, ঝগড়া, পরচর্চা, অভিশাপ ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা।

 কথার আমানত

ইসলামে কথার আমানতকে প্রচুর গুরত্ব দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি আপনাকে কোনো গোপন বা অন্য কথা বললে যেটি একই বারের মতো কাউকে প্রকাশ কর যাবে না এবং সে আপনাকে যদি আপনাকে প্রকাশ করতে বারণ করে বা ন করে তাও আপনি তা প্রকাশ করতে পারবেন না কারণ সেটা হবে আপনার আমানত। আর আমানতের খিয়ানত করা ভীষণ পাপ জনক কাজ।অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা কারো গোপনীয় বস্তু প্রকাশ করনা, কারণ সেটা মুনাফিকের লক্ষন। আর যে ব্যক্তি অপর ব্যক্তির গোপনীয় লুকিয়ে রাখবে কাল কিয়ামতে দিন আল্লাহ তায়ালা তার গোপনীয় বস্তুকে  প্রকাশ করতে দেবেনা। সেই ব্যক্তিকে ডাকা হবে পর্দার আড়ালে এবং আল্লাহ বলবে, কাল তুমি অপর ব্যক্তির গোপনীয় বিষয়কে লুকিয়ে রেখেছিলে তাই আজ আমি তোমার গোপনীয় বস্তুকে লুকিয়ে দিলাম।

পরামর্শের ক্ষেত্রে আমানত

পরামর্শের ক্ষেত্রে আমানত বলতে এটি ব্যাবসা বাণিজ্যের  ক্ষেত্রে পরামর্শ বা কোনো রায় চায় বা আপনাকে কোনো রায় বললো, সেটা তার জন্য লাভজনক তাহলে সেটা একধরনের আমানত। আর সেটা অপর ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করা আমানতের খিয়ানত হবে।

খেয়ানতকারীর পরিণতি

কাল  কিয়ামতের দিন অঙ্গীকার ও বিশ্বাস ভঙ্গকারী ব্যক্তিদের ডেকে বলা হবে, এটি অমুকের সন্তান অমুকের বিশ্বাসঘাতকতা। আর যে ব্যাক্তি আমানতে খিয়ানত করবে কাল কিয়ামতের ময়দানে তাকে সাই বস্তু নিয়ে কবর থেকে ওঠানো হবে।

আমানত রাখার সময় ভেবে-চিন্তে রাখা :

আমানত হলো, সাধারণত কারো কাছে কোনো হালাল উপায়ে অর্জিত অর্থ-সম্পদ গচ্ছিত রাখা। এখানে একটা বিষয় ভালোভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তা যেন অবৈধভাবে উপার্জিত না হয়। যেমন, চুরি, ডাকাতি, ছিনিয়ে আনা সম্পদ আমানত রাখলে তা আমানত হিসেবে গণ্য হবে না; বরং তার মূল মালিকের খোঁজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে অবগত করতে হবে এবং তার অর্থ-সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি আমানত গ্রহীতা সব জেনেও মূল মালিকের কাছে বিষয়টি গোপন রাখে তবে চোর, ডাকাত এবং ছিনতাইকারী চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই করে যে গোনাহের কাজ করল, গচ্ছিত রাখনেওয়ালা সত্যকে গোপন রেখে ততটুকুই গোনাহের কাজ করল। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন,

‘মানুষ যখন কোনো অন্যায়কারীকে দেখেও অন্যায় থেকে তার হাতকে প্রতিরোধ করবে না, অতিসত্বর আল্লাহ তাদের সবার ওপর ব্যাপক আজাব নাজিল করবেন।’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)।

সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার কোনো বিকল্প নেই। একটি সমাজে অপরাধ তখনই বেড়ে যায়, যখন অপরাধী বারবার অপরাধ করে পার পেয়ে যায়। তাই মহান আল্লাহ সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,

‘হে ঈমানদাররা! ন্যায়বিচারে তোমরা অটল থেক, আল্লাহর পক্ষে সাক্ষ্য প্রদানকালে যদিও নিজেদের প্রতিকূলে যায় অথবা বাবা-মা ও নিকটাত্মীয়দের, সে ধনী হোক বা গরিব, আল্লাহই উভয়ের জন্য উত্তম অভিভাবক। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করতে নিজ নিজ খেয়ালখুশির বশীভূত হয়ো না।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ১৩৫)।

অন্যায়ের প্রতিবাদ মোমিন ব্যক্তি কখন কিভাবে করবে তার নির্দেশনাও রাসুলুল্লাহ (সা.) দিয়েছেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন,

‘তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় দেখলে সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিহত করো, যদি সে তাতে সক্ষম না হয়, তবে সে যেন মুখে প্রতিবাদ করে; আর যদি সে তাতেও সক্ষম না হয়, তবে মনে মনে তা পরিবর্তনের পরিকল্পনা করো। এটাই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪৯)।

কোন কোন বস্তু আমানত হিসেবে হবে :

আমানত শুধু ধনসম্পদ নয়, বরং ব্যাপকার্থে যেকোনো জিনিস গচ্ছিত রাখাকেই আমানত বলে। আমানত শুধু অর্থ-সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বিষয়বস্তু ব্যাপক। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, সরকারি-বেসরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রম, শিক্ষকতা, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্ব, মজুরি ইত্যাদি সবই আমানতের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ মানুষের সুস্থ বিবেক, হাত-পা, চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ঠোঁট ইত্যাদি প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই অপরের কাছে আমানতস্বরূপ। পক্ষান্তরে নিজের কাছেও আমানতস্বরূপ। এগুলোর ব্যবহার প্রসঙ্গে বিচার দিবসে জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘চোখের খিয়ানত এবং অন্তর যা গোপন রাখে তা তিনি জানেন।’ (সুরা আল মুমিন : ১৯)। অনুরূপভাবে, শরিয়তের ফরজ কাজ, সতীত্বের হিফাজত, ফরজ গোসল, নামাজ, জাকাত, রোজা, হজ ইত্যাদিও আমানত। এ কারণে বেশির ভাগ মনীষী বলেন, ‘দ্বীনের যাবতীয় কর্তব্য আমানতের অন্তর্ভুক্ত। (তাফসিরে কুরতুবি, ১৪তম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭৯)।

হজরত আলী (রা.)-এর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর একদা রাতের বেলা বাতির আলোতে রাষ্ট্রীয় কাজ করছিলেন। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি বিশেষ প্রয়োজনে তার কাছে এলেন। আলী (রা.) বাতি নিভিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন। তাকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জবাব দিলেন, এতক্ষণ আমি সরকারি কাজ করছিলাম। তাই সরকারি তৈল ব্যবহার করেছি। এখন তো ব্যক্তিগত কাজ করছি। সরকারি বাতি ব্যবহার করা আমানতের খেয়ানত হবে।

দায়-দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে যোগ্য, কর্মদক্ষ এবং আমানতদার ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা উচিত। অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া কেয়ামতের লক্ষণ। এ মর্মে নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন,

‘যখন আমানত নষ্ট করা হবে তখন কেয়ামতের অপেক্ষায় থাক। জিজ্ঞাসা করা হলো, আমানত কীভাবে নষ্ট করা হবে? তিনি বললেন, অযোগ্য ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব অর্পণ করা আমানত নষ্টকরণের শামিল। আর এমনটি করা হলে বুঝবে কিয়ামত সন্নিকটে।’ (বোখারি : ৫৯)।

আমানতের খিয়ানত করা কবিরা গুনাহ ও মুনাফিকের আলামত, আর আমানত রক্ষা করা ঈমানদারের আলামত। হাদিসে এসেছে রাসুল (সা.) বলেছেন,

‘যার মধ্যে আমানতদারী নেই তার ঈমান নেই, আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না, তার দ্বীন নেই।’ (সুনানে বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান, মিশকাত, পৃষ্ঠা ১৫)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, যখন দুই পক্ষ মিলে যৌথ কোনো কাজ করে, আমি তখন তাদের তৃতীয় পক্ষ হই। যে পর্যন্ত তারা পরস্পরের সঙ্গে খিয়ানত তথা বিশ্বাসঘাতকতা না করে।’ (সুনানে আবু দাউদ)।

রাসুল (সা.) আরো বলেন, ‘যে তোমাকে বিশ্বাস করে তার বিশ্বাস রক্ষা করো, আর যে তোমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তুমি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করো না।’ রাসুল (সা.) অন্যত্র বলেছেন, ‘মোমিনের মধ্যে আর যত দোষই থাক, খিয়ানত তথা বিশ্বাসঘাতকতা ও মিথ্যাচার থাকতে পারে না।’ (মুসনাদে আহমদ)।

উপরোক্ত আলোচনা ও আয়াতের আলোকে বুঝা যাচ্ছে যে, আমানত একটি মহৎ গুণ। নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করার মাধ্যমে মানুষ আমানত রক্ষা করতে পারে। আমরা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে আমানত রক্ষা করতে সচেষ্ট হব। জীবনে আর কখনো আমানতের খিয়ানত করা যাবে না। জীবনে আর কখনো ওয়াদা ভঙ্গ করা যাবে না। আল্লাহ আমাদের আমল করার তওফিক দান করুন-আমিন।

সংগৃহীত