শিরক হচ্ছে অংশীদার স্থাপন। ইসলামের পরিভাষায় কোরআন সুন্নাহতে আল্লাহর যে সমস্ত নাম ও গুণাবলি উল্লিখিত হয়েছে সেগুলোকে অবিশ্বাস করা, যে সব কাজের জন্য (ইবাদত ও আমল) আল্লাহ বান্দাদের সৃষ্টি করেছেন তাতে তার একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত করা থেকে বিরত থাকাকে শিরক বলে।

আমল বিধ্বংসী এ কাজ সৎকর্মশীলদের সকল নেক আমল ধ্বংস করে দেয়। এর পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। মুশরিকের জন্য পরকালে জাহান্নাম অবধারিত। সকল নবী ও রাসূল প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিরক নামক ব্যাধি থেকে মানবতাকে মুক্ত করে তাওহীদের আলোতে আলোকিত করা।

শিরক শব্দের অর্থ

শিরক অর্থ হচ্ছে অংশীদার সাব্যস্ত করা, সমকক্ষ মনে করা ইত্যাদি। যেমন বলা হয়-  সে আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করেছে, অর্থাৎ তাঁর রাজত্বের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করেছে।

শিরক এর সংজ্ঞা

১. আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে আহ্বান করা অথবা ইবাদতের প্রকারসমূহ থেকে কোনো কিছুকে কারো দিকে ফিরানোকে শিরক বলে ।

২. শিরক হচ্ছে আল্লাহর এমন কোনো সমকক্ষ স্থির করা, যাকে আল্লাহর মতোই ডাকা হয়, ভয় করা হয় ও তার কাছে আশা করা হয়, আল্লাহর মতোই তাকে ভালোবাসা নিবেদন করা হয়।

শিরক কত প্রকার

শিরক প্রধানত ২ প্রকার।

১. বড় শিরক: শিরকে আকবর তথা বড় শিরক বলা হয়, ইবাদতের কোনো প্রকারকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ।

২. ছোট শিরক হচ্ছে : এটি হচ্ছে লোক দেখানো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন –

সূতরাং যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে সে যেন সৎকর্ম করে আর তার প্রতিপালকের ইবাদতে যেন কাউকে শরীক না করে। [সূরা কাহাফ ১১০]

৩: গোপন শির্ক: এর দলীলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম) বলেন:এ উম্মতের মাঝে শির্ক এমন গোপনীয় ভাবে প্রবেশ করে যে ভাবে অন্ধকার রাত্রিতে কালো পাথরে পিপিলিকা হাটলে টের পওয়া যায় না।

“যে বিষয়ে আমি তোমাদের উপরে সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তা হল ছোট শির্ক”। ছাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! ছোট শির্ক কি? তিনি বললেন, “ছোট শির্ক হচ্ছে লোক দেখানো ইবাদত” (মুসলিম)। অনুরূপভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করাও ছোট শির্কের অন্তর্ভুক্ত। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করে, সে কুফরী করে অথবা শির্ক করে” (তিরমিযী)।

বড় শিরক চার প্রকার:

১-দো‘আর ক্ষেত্রে শিরক: আল্লাহ তা‘আলা বলেন-

তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে তখন তারা বিশুদ্ধ চিত্তে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে; অতঃপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়। [সূরা আনকাবূত ৬৫]

২- নিয়ত, ইচ্ছা এবং কথার ক্ষেত্রে শিরক: আল্লাহ তা‘আলা বলেন –

যে ব্যক্তি শুধু পার্থিব জীবন ও এর জাঁকজমক কামনা করে আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মগুলির ফল দৃনিয়াতেই পরিপূর্ণভাবে প্রদান করে দেই এবং দুনিয়াতে তাদের জন্য কোনো কিছুই কম করা হয় না। তারা এমন লোক যে, আখেরাতে তাদের জন্য জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই নেই, আর তারা যা কিছূ করেছিল তা সবই আখেরাতে বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং যা কিছু করছে তাও বিফল হবে। [সূরা হূদ ১৫-১৬]

৩- আনুগত্যের ক্ষেত্রে শিরক: আল্লাহ তা‘আলা বলেন –

তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের আলেম ও ধর্মযাজকদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে এবং মরিয়মের ছেলে ঈসাকেও অথচ তাদের প্রতি শুধু এ আদেশ করা হয়েছে যে, তারা শুধুমাত্র এক মা’বূদের ইবাদত করবে, যিনি ব্যতীত যোগ্য কোনো উপাসক নেই, বস্তুত: তিনি তাদের অংশী স্থির করা হতে পবিত্র। [সূরা তাওবা ৩১]

৪- ভালবাসার ক্ষেত্রে শিরক: আল্লাহ তা‘আলা বলেন –

এবং মানুষের মধ্যে কিছু লোক আছে যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে সদৃস স্থির করে নেয়, তারা আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবেসে থাকে এবং যারা ঈমানদার আল্লাহর প্রতি তাদের ভালবাসা অধিক দৃঢ়তর, আর যারা অত্যাচার করেছে তারা যদি শাস্তি অবলোকন করতো তাহলে বুঝতো যে, সমুদয় শক্তি আল্লাহর জন্যে এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। [সূরা বাকারা ১৬৫]

শিরকের পরিণতি:

১. শিরকের পাপ আল্লাহ ক্ষমা করেন না : তওবা তথা অনুতপ্ত হয়ে পাপ বর্জন করা সকল পাপের ক্ষমার মাধ্যম। তবে মহান আল্লাহ্ তওবা ছাড়াও সৎকাজের কারণে শাস্তির মাধ্যমে বা তাঁর অপার করুণায় অন্যসব পাপ ক্ষমা করতে পারেন। তবে শিরকের পাপ তিনি ক্ষমা করবেন না বলে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন

২. শিরক সকল পুণ্য কর্ম ধ্বংস করে : আল্লাহর সাথে অংশী স্থাপনকারীদের সকল কর্ম নিষ্ফল হবে এবং পরকালে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেউ ঈমানের সাথে কুফরী করলে তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

৩. শিরক জাহান্নামের অনন্ত শাস্তির কারণ : মহান আল্লাহ অংশীবাদীদের জন্য চির শান্তির আবাস জান্নাত নিষিদ্ধ করবেন। পরিণামে তাদের জন্য তৈরি রয়েছে চির শাস্তির স্থান জাহান্নাম।

৪. শিরককারীর জানমালের বিধান : শিরককারীর জানমাল অন্যান্যদের জন্য হালাল করা হয়েছে। শিরক একটি জঘন্যতম অপরাধ। একটি শিরকের দ্বারা সারা জীবনের সমস্ত ভালো আমল নষ্ট হয়ে যায় এবং ব্যক্তি জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে যায়। তবে একনিষ্ঠ তওবার মাধ্যমে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সুতরাং শিরক সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান লাভপূর্বক শিরক থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।

৫. জাহান্নাম ওয়াজিব করে দেয় :

মানুষকে শিরক জাহান্নামে নিয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন,

‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হবে জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোন সাহায্যকারী নেই’ (আল মায়িদাহ :৭২)।

ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

‘আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (রাবী বলেন) আমি জিজ্ঞেস করলাম, যদি সে যেনা করে এবং চুরি করে থাকে তবুও? তিনি বললেন, যদিও সে যেনা করে এবং চুরি করে থাকে’।

অন্য হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে মৃত্যুবরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’।

৬. সবচেয়ে বড় গুনাহ :

বীরা তথা বড় গুনাহের একটি হ’ল শিরক। একবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ছাহাবীগণকে লক্ষ্য করে বললেন,

‘আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে সংবাদ দিব না? আমরা বললাম, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তিনি বললেন, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া’।

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে বেঁচে থেকো। ছাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! ঐ ধ্বংসাত্মক জিনিসগুলো কি কি? তিনি জবাবে বললেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা যা আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন, সূদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা, সরলা নির্দোষ সতী-সাধ্বী মুমিনা মহিলাকে অপবাদ দেওয়া’।[সহীহ বুখারী, ইফা: ২৫৭৮]

অন্য হাদীসে রাসূল (স.) বলেন, সবচেয়ে বড় গুনাহ তিনটি (১) আল্লাহর সাথে শরীক করা (২) পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং (৩) মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া’।

৭. জঘন্যতম পাপ : 

যেসব কাজ করলে আল্লাহর আনুগত্যের পরিবর্তে পাপ অর্জিত হয় শিরক তার অন্যতম। শিরককে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ছাঃ) জঘন্যতম পাপ বলে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহর সাথে শিরক করল সে জঘন্য পাপ করল’ (আন্ নিসা :৪৮)।

আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর নিকট জঘন্যতম পাপ কোনটি? জবাবে তিনি বললেন, কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানানো (শরীক করা), অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’। [ বুখারী, ইফা: ৫৫৭৫]

আল্লাহর সঙ্গে শিরক কত প্রকারের হতে পারে?

১. আল্লাহকে অস্বীকার করা:

আল্লাহ তাআলাকে ইবাদতের উপযুক্ত মনে না করে তার সঙ্গে শিরক করা। ইবাদত পাওয়ার একমাত্র উপযুক্ত সত্তা আল্লাহ তাআলাকে না মেনে তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে যোগ্য বলে মনে করা। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন-

‘আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্য স্থির কর না। তাহলে নিন্দিত ও (আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে) বিতাড়িত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল : আয়াত ৩৯)

‘আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্য স্থির করো না। তাহলে তুমি নিন্দিত ও অসহায় হয়ে পড়বে।’ (সুরা বনি ইসরাঈল : আয়াত ২২)

‘যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে অন্য উপাস্যকে ডাকে, যার কোন সনদ তার কাছে নেই, তার হিসাব তার পালনকর্তার কাছে রয়েছে। নিশ্চয়ই কাফিররা সফলকাম হবে না।’ (সুরা মুমিনুন : আয়াত ১১৭)

‘(হে নবি!) আপনি আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকবেন না। তাহলে আপনি শাস্তিতে নিপতিত হবেন।’ (সুরা শুআরা : আয়াত ২১৩)

২. মৃতব্যক্তির কাছে দোয়া করা

মৃতব্যক্তির কাছে কিছু চাওয়া বা অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য দোয়া করা শিরকে আকবার তথা বড় শিরক। কোনো মুমিন যদি এ কাজ করে তবে তার ঈমান বিনষ্ট হয়ে যাবে। কারণ ভাল-মন্দ দেওয়া, না দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি বলেন-

‘(হে নবি!) আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন বস্তুর ইবাদত কর, যে তোমাদের অপকার ও উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। অথচ আল্লাহ সব শুনেন ও জানেন।’ (সুরা মায়েদা : আয়াত ৭৬)

৩. মৃতব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া

মৃতব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া বা কাউকে গাওছুল আজম (সর্বোচ্চ সহযোগিতাকারী) মনে করাও বড় গুনাহের অন্তর্ভুক্ত; যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। মহান আল্লাহ বলেন-

‘তোমরা তো আল্লাহর পরিবর্তে কেবল প্রতিমারই পূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করছ, তারা তোমাদের রিজিকের মালিক নয়। কাজেই আল্লাহর কাছে রিযিক তালাশ কর, তাঁর ইবাদত কর এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’ (সুরা আনকাবুত : আয়াত ১৭)

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পরিবর্তে এমন বস্তুর পূঁজা করে, যে কেয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? তারাতো তাদের পূঁজা সম্পর্কেও বেখবর।’ (সুরা আহকাফ : আয়াত ৫)

কোন কিছু চাইতে হলে শুধু আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

‘যখন তুমি কোন কিছু চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে তখন আল্লাহর কাছেই করবে।’ (তিরমিজি ২৫১৬; জামে ৭৯৫৭)

৪. আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে মানত করা

আল্লাহ ছাড়া মৃত বা জীবিত কারো নামে মানত করা শিরক। গায়রুল্লাহর নামে মানত করলে ঐ মানত পূর্ণ করা যাবে না। হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন-

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের কাজে মানত করে, সে যেন তা পূরা করার মাধ্যমে তার আনুগত্য করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানিমূলক কাজে মানত করে, সে যেন তার নাফরমানি না করে। (অর্থাৎ মানত পূরা না করে)।’ (বুখারি ৬৬৯৬)

নযর বা মানত করা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হবে, যদি তা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে হয়। আর আল্লাহর নামে মানত করলে তা আদায় করা ওয়াজিব। আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে মানত করলে তা শিরক হবে। বিধায় তা পূর্ণ করা হারাম। এরূপ মান্নতের নিয়ত করে থাকলে তা ত্যাগ করতে হবে এবং তওবা করতে হবে। (ফাতহুল মাজিদ ১৩৬ পৃষ্ঠা)

৫. মুশরিকদের পশু জবাইয়ের স্থানকে নির্ধারণ করা

যে স্থানে মুশরিকরা তাদের দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে পশু জবাই করে সে স্থানটি শিরকের নিদর্শনে পরিণত হয়। কারণ এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, দেব-দেবীর নৈকট্য পাওয়া। আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা। একারণেই যদি কোনো মুসলমান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়তেও উক্ত স্থানে পশু জবাই করে, তবুও তা হবে মুশরিকদের অনুরূপ কাজ। মুশরিকদের দৃষ্টিতে তাদের পুণ্যময় স্থানের অংশীদার। মুশরিকদের কোন কাজের সঙ্গে বাহ্যিক বা আভ্যন্তরীণ মিল তাদের প্রতি আসক্তিরই নামান্তর। (তাওহীদের মর্মকথা, ৬৬ পৃষ্ঠার টীকা)

মৃতব্যক্তির নামে কোন কিছু জবাই করাও হারাম। মহান আল্লাহ বলেন-

‘তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃতপ্রাণী, রক্ত, শূকরের গোশত, যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়’। একটু পরেই বলেন, ‘যে জন্তু যজ্ঞবেদীতে যবেহ করা হয় এবং যা ভাগ্য নির্ধারক শর দ্বারা বণ্টন করা হয় (তাও হারাম)। এসব পাপ কাজ।’ (সুরা মায়েদা : আয়াত ৩)

এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

‘(১) যে ব্যক্তি নিজ পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেয় তার উপর আল্লাহর লানত (২) যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু-প্রাণী জবাই করে তার উপর আল্লাহর লানত (৩) যে ব্যক্তি কোন বিদআতীকে আশ্রয় দেয় তার উপর আল্লাহর লানত (৪) যে ব্যক্তি জমির সীমানা পরিবর্তন করে, তার উপর আল্লাহর লানত।’ (মুসলিম ১৯৭৮; মিশকাত ৪০৭০)

উল্লিখিত বিষয় সমূহ সুস্পষ্ট রূপে শিরকে আকবর, যা থেকে বিরত থাকা একান্ত প্রয়োজন। কেননা আল্লাহ তাআলা শিরকের ব্যাপারে বলেন-

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না। তবে অন্যান্য গুনাহ ক্ষমা করতে পারেন। আর যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়।’ (সুরা নিসা : আয়াত ১১৬)

নিশ্চয়ই যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক স্থাপন করে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার আবাসস্থল হয় জাহান্নাম। আর জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সুরা মায়েদা : আয়াত ৭২)

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক জিনিস থেকে বেঁচে থাক। সাহাবায়েকেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! ঐ ধ্বংসাত্মক জিনিসগুলো কি? তিনি জবাবে বললেন, (১) ‘আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, (২) যাদু করা, (৩) অন্যায়ভাবে এমন কোন ব্যক্তিকে হত্যা করা, যাকে আল্লাহ হারাম করেছেন, (৪) সুদ খাওয়া, (৫) এতিমের ধন-সম্পদ ভোগ করা, (৬) ধর্মযুদ্ধ কালীন সময়ে (রণক্ষেত্র) থেকে পলায়ন করা, (৭) সতী-সাধ্বী মুমিন নারীদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করা।’ (বুখারি ৬৮৫৭; মুসলিম ৮৯)

সংগৃহীত