জীবনে চলার পথে মানুষে মানুষে ঝগড়া-বিবাদ হয়। পাড়া প্রতিবেশীর মাঝে ভুল বোঝাবুঝি হয়। ঘর-সংসারে, পরিবারে মান অভিমান হয়। বন্ধু-বান্ধব ও আপনজনের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হয়। এসব পরিস্থিতিতে ইসলাম সবাইকে আপস-মীমাংসার তাগিদ দেয়। সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করার প্রতি উৎসাহিত করে। পরস্পরের মধ্যে ভালো সম্পর্ক পুনরায় গড়ে তোলার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। আপস-মীমাংসাকে ইসলাম একটি পৃথক ইবাদত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
যারা আপস মীমাংসা করে দিবে তাদের জন্য ঘোষিত হয়েছে অসংখ্য সওয়াব ও পুরস্কার। হযরত আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি কি তোমাদের এমন একটি আমলের কথা জানাব না, যার মর্যাদা রোজা, সদকা ও নামাজ থেকেও বেশি। আমরা বললাম, হ্যাঁ, জানিয়ে দিন। তিনি বললেন, বিবাদকারীদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দেয়া। পক্ষান্তরে দুজনের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করা নেক আমল ধ্বংসকারী। (আবু দাউদ ও তিরমিজি শরীফ)
এ হাদিস দ্বারা বুঝা যায় যে, দুই মুসলমানের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দেয়া সর্বোত্তম আমল। আল্লাহ তায়ালা চান, তাঁর বান্দারা দুনিয়ায় মিলেমিশে থাকুক। সবাই পরস্পর ভালো সম্পর্ক স্থাপন করুক। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
প্রতি সপ্তাহে দুবার সোম ও বৃহস্পতিবার সব মানুষের আমলগুলো আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। তখন সব মুমিন বান্দাকে মাফ করে দেয়া হয়। তবে সেই ব্যক্তিকে নয়, যে তার কোনও মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে শত্রুতা বজায় রাখে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়, যাতে তারা আপস-মীমাংসা করে নিতে পারে, সেজন্য তাদের সুযোগ দান করা হয়। (মুসলিম শরিফ)।
আপস-মীমাংসা করা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ আমল যে, তা করতে গিয়ে যদি কেউ মিথ্যাও বলে, আল্লাহ তা মাফ করে দেন। হযরত উম্মে কুলসুম বিনতে ওকবা ইবনে আবু মুইত (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
ওই ব্যক্তি মিথ্যাবাদী নয়, যে মানুষের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দেয় এবং উভয় পক্ষকে উত্তম কথা বলে। এর একজনের পক্ষ থেকে অন্যজনকে ভালো কথা শোনায় (যদিও বা মিথ্যা হয়)। (বুখারী ও মুসলিম শরীফ:)।
আল্লার কাছে দুই মানুষের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করার আমলটি অনেক প্রিয়। পক্ষান্তরে দুই মুসলমানের মধ্যে সম্পর্ক ছিন্ন রাখা অত্যন্ত নিন্দনীয় আমল। আল্লাহ বলেন,
‘আর যদি মুমিনদের দুটি দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।…তারপর যদি দলটি ফিরে আসে তাহলে তাদের মধ্যে ইনসাফের সঙ্গে মীমাংসা করো এবং ন্যায়বিচার করো। নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও।’ (সুরা হুজুরাত: ৯-১০)
তিনি আরও বলেন,
‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং পরস্পরের মধ্যকার অবস্থা সংশোধন করে নাও।’ (সুরা আনফাল: ১)
একটা সাধারণ তর্কবিতর্ক যখন ঝগড়ায় রূপ নেয় তখন যেকোনো একজনের উচিত সংযত হয়ে যাওয়া। ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে নিজ দাবি থেকে খানিকটা সরে আসা। এটাই বুদ্ধিমানের কাজ। ন্যায়ের ওপর থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি এই কাজটা করতে পারে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন। এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে,
‘যে ব্যক্তি ন্যায়ের ওপর থাকা সত্ত্বেও বিবাদ পরিহার করে, তার জন্য জান্নাতের মাঝে একটি ঘর তৈরি করা হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৯৩)
কিন্তু কখনো কখনো ঝগড়া-বিবাদ এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যে এর আপস নিষ্পত্তি নিজেদের সক্ষমতার বাইরে চলে যায়। একে অপরের চেহারা দেখলেই গা জ্বালা ধরে। এ ক্ষেত্রে মান্যবর কর্তাব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে এবং তাদের মধ্যে মীমাংসার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
‘তাদের বেশির ভাগ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই। কিন্তু দান-সদকা, সৎকাজ অথবা মানুষের মাঝে আপস করার নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে কল্যাণ রয়েছে। আর যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এ কাজ করবে আমি তাকে অতি শিগগির মহা প্রতিদান দান করব।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১৪)
মীমাংসার আদেশকারীর মহা প্রতিদান হলে মীমাংসাকারীর কী প্রতিদান হবে—তা সহজেই অনুমেয়। দাম্পত্য জীবনের সমস্যাগুলোও মীমাংসার মাধ্যমে সমাধান হতে পারে। যখন স্বামী-স্ত্রী নিজেরা সমাধান করতে না পারবে তখন উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে বিচারক নিযুক্তির মাধ্যমে মীমাংসা করার ভূমিকা নিতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে,
‘যদি তোমরা উভয়ের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের আশঙ্কা করো, তাহলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন, স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক নির্ধারণ করো। যদি তারা উভয়ে মীমাংসার ইচ্ছা করে তবে আল্লাহ তাদের উভয়ের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সব কিছু অবহিত।’ (সুরা : নিসা, আয়াত: ৩৫)
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে পরস্পর মিলেমিশে থাকার তাউফিক দান করুক। (আমিন)
সংগৃহীত