রমজান মাসের রাতে এশার ফরজ ও সুন্নতের পর এবং বিতরের আগে আদায়কৃত ২০ রাকাত বিশিষ্ট একটি বিশেষ সুন্নাত নামাজ, যা প্রতি চার রাকাত পরপর বিরতি নিয়ে পড়া হয়। “তারাবি” শব্দটির অর্থ বিশ্রাম বা প্রশান্তি। এটি কিয়ামুল লাইল বা রাতের ইবাদতের অংশ, যা পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত সহকারে জামাতের সাথে আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
তারাবির নামাজের খুঁটিনাটি:
- সময়: এশার ফরজ ও দুই রাকাত সুন্নতের পর থেকে সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত।
- রাকাত সংখ্যা: অধিকাংশ ফকীহর মতে এটি ২০ রাকাত, তবে ৮ বা ১০ রাকাত পড়ার প্রচলনও রয়েছে।
- নিয়ম: দুই রাকাত করে মোট ১০ সালামে ২০ রাকাত নামাজ পড়া। চার রাকাত পরপর বিশ্রাম নেওয়া হয়।
- নিয়ত: “আমি কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত তারাবি সুন্নাত নামাজের নিয়ত করছি; আল্লাহু আকবার”।
- ফজিলত: রমজানের রাতে এই সালাত আদায়কারীকে পূর্বের পাপসমূহ থেকে ক্ষমা করা হয়।
তারাবির নামাজ রমজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং এটি জামাতের সাথে আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
তারাবীর নামাযের হুকুম ও ফযীলত
হাদীস শরীফে এসেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমযানের রাতে ইবাদত করবে তার অতীতের গোনাহ-খাতা মাফ করে দেওয়া হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৭
সর্বপ্রথম তারাবীর নামায পড়েছেন কে?
সর্বপ্রথম যিনি এই নামায চালু করেছেন তিন হলেন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বিষয়টি একাধিক হাদীসে বিবৃত হয়েছে। আয়েশা রা. বর্ণনা করেন-
রমযানের এক রাতে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে গিয়ে নামাযে দাঁড়িয়েছেন। কিছুসংখ্যক সাহাবী তাঁর পিছনে ইক্তিদা করেছেন। দ্বিতীয় রাতেও তিনি নামায পড়েছেন। এ রাতে প্রচুর মুসল্লী হয়েছে। এরপর তৃতীয় বা (রাবী বলেছেন) চতুর্থ রাতে সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে জড়ো হয়েছেন; কিন্তু ঐ রাতে তিনি কামরা থেকে বের হননি।সকাল হলে তিনি সাহাবাদের লক্ষ করে বললেন, তোমরা যে এসেছো তা আমি দেখেছি। তবে, আমি তোমাদের কাছে আসিনি এ আশঙ্কায় যে, না জানি এই নামায তোমাদের উপর ফরয করে দেওয়া হয়। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৭৬১
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত-
একদা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কামরা থেকে বের হয়ে মসজিদে আসলেন। দেখেন, কিছু লোক মসজিদের এককোণে নামায পড়ছে। জিজ্ঞেস করলেন, এরা কী করছে? বলা হল, তারা নিজেরা কুরআনের হাফেয নয়, তাই উবাই ইবনে কা‘বের পিছনে নামায পড়ছে। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা ঠিক করেছে। কাজটা খুব ভালো হয়েছে।
আরবি এবং বাংলা উভয়ভাবে নিয়ত করা যাবে। আরবি নিয়ত হচ্ছে,
নাওয়াাইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা, রকাআতাই সালাতিত তারাবিহ, সুন্নাতু রাসুলিল্লাহি তাআলা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
বাংলায় নিয়ত হচ্ছে, আমি কেবলামুখি হয়ে দুই রাকাআত তারাবির সুন্নতে মুয়াাক্কাদাহ নামাজের নিয়ত করছি। আল্লাহু আকবার। (জামাআত হলে যোগ করতে হবে এ ইমামের পেছনে পড়ছি)।
তারাবি নামাজের নিয়ত আরবিতে করা আবশ্যক বা বাধ্যতামূলক নয়। বাংলাতেও এভাবে নিয়ত করা যাবে যে, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তারাবি -এর দুই রাকাত নামাজ কেবলামুখী হয়ে পড়ছি।
তারাবির নামাজ যেভাবে পড়বেন
দুই রাকাত নামাজ আদায় করে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করা। আবার দুই রাকাত নামাজ পড়া। এভাবে ৪ রাকাত আদায় করার পর একটু বিশ্রাম নেয়া।বিশ্রামের সময় তাসবিহ তাহলিল পড়া, দোয়া-দরূদ ও জিকির আজকার করা। তারপর আবার দুই দুই রাকাত করে আলাদা আলাদা নিয়তে তারাবি আদায় করা।
তারাবি নামাজের দোয়া
তারাবি নামাজে প্রতি চার রাকাত পর বিশ্রাম নেওয়া হয়। এ সময় একটি দোয়া পড়ার প্রচলন রয়েছে আমাদের দেশে। প্রায় সব মসজিদের মুসল্লিরা এই দোয়াটি পড়ে থাকেন। দোয়াটি হলো-
‘সুবহানা জিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানা জিল ইয্যাতি ওয়াল আঝমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিব্রিয়ায়ি ওয়াল ঝাবারুতি। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাজি লা ইয়ানামু ওয়া লা ইয়ামুত আবাদান আবাদ; সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রূহ।’
তবে মনে রাখতে হবে, তারাবি নামাজ বিশুদ্ধ হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে এই দোয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এই দোয়া না পড়লে তারাবি নামাজ হবে না, কোনোভাবেই এমন মনে করা যাবে না। মূলত এ দোয়ার সঙ্গে তারাবি নামাজ হওয়া কিংবা না হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
এ সময় কুরআন-হাদিসে বর্ণিত যেকোনো দোয়াই পড়া যাবে। আলেমদের মতে, তারাবি নামাজে চার রাকাত পর বিশ্রামের সময়টিতে কুরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া, তওবা,-ইসতেগফারগুলো পড়াই উত্তম।
একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, কোনো কারণবশত যদি একদিন তারাবির নামাজ পড়তে না পারেন তাহলে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। নামাজ না পড়ার শাস্তির ভোগ করতে হবে। সমাজের অনেকেই মনে করেন তারাবির নামাজ আদায় না করলে রোজা হবে না, অথচ এমন কোন কথা কুরআন-হাদিসে নেই। এটা সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা