রোজা সঠিকভাবে পালনের জন্য এর শর্ত (শরায়েত), রুকন (মূল স্তম্ভ) এবং ভঙ্গের কারণ জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোজার শর্ত (শরায়েত)
শর্ত বলতে সেই বিষয়গুলো বোঝায়, যেগুলো ছাড়া রোজা সহিহ হবে না বা ফরজ হবে না।
(ক) মুসলিম হওয়া
রোজা ইসলামের ফরজ বিধান। অমুসলিমের উপর এটি প্রযোজ্য নয়। আল্লাহ বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে…”
— আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩
এখানে সম্বোধন করা হয়েছে “হে ঈমানদারগণ”—অর্থাৎ মুসলিমদের।
(খ) প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেকবান হওয়া
শিশু ও পাগলের উপর রোজা ফরজ নয়। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত, শিশু বালেগ হওয়া পর্যন্ত, এবং পাগল সুস্থ হওয়া পর্যন্ত।”
— সুনান আবু দাউদ
অতএব, বালেগ ও সুস্থ মস্তিষ্কের মুসলিমের উপর রোজা ফরজ।
(গ) সক্ষমতা থাকা
অসুস্থ ও মুসাফিরের জন্য ছাড় রয়েছে। আল্লাহ বলেন:
“তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনে রোজা পূরণ করবে।”
— আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা ২:১৮৪-১৮৫
এ থেকে বোঝা যায়—ইসলাম সহজতার ধর্ম।
(ঘ) হায়েজ-নিফাসমুক্ত হওয়া
ঋতুমতী ও প্রসূতি নারীর জন্য রোজা রাখা বৈধ নয়; পরে কাজা করতে হবে। আয়িশা (রা.) বলেন:
“আমাদের হায়েজ হলে রোজার কাজা করতে বলা হতো, কিন্তু নামাজের কাজা করতে বলা হতো না।”
— সহিহ মুসলিম
রোজার রুকন (মূল স্তম্ভ)
রুকন হলো রোজার মৌলিক উপাদান, যা ছাড়া রোজা সহিহ হবে না।
(১) নিয়ত (ইচ্ছা করা)
রোজা রাখার জন্য নিয়ত অপরিহার্য। নিয়ত অন্তরের কাজ। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“নিশ্চয়ই সমস্ত কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।” — সহিহ বুখারি
ফরজ রোজার ক্ষেত্রে সুবহে সাদিকের আগে নিয়ত করতে হয়।
(২) সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা
আল্লাহ বলেন:
“তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে পৃথক হয়ে যায়; অতঃপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।”
— আল-কুরআন, সূরা আল-বাকারা ২:১৮৭
এ আয়াতে রোজার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোজা ভঙ্গের কারণ
নিচে কুরআন ও সহিহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত কিছু প্রধান ভঙ্গের কারণ উল্লেখ করা হলো:
(১) ইচ্ছাকৃত পানাহার
ইচ্ছাকৃতভাবে খাওয়া বা পান করলে রোজা ভেঙে যায়। আয়াত (২:১৮৭) থেকে বোঝা যায়—ফজর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিরত থাকতে হবে।
কিন্তু ভুলে খেলে? রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ভুলে খেয়ে ফেলল বা পান করল, সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে; কারণ আল্লাহই তাকে খাইয়েছেন।” — সহিহ বুখারি
(২) স্বেচ্ছায় যৌন সম্পর্ক
রমজানে দিনের বেলায় ইচ্ছাকৃত সহবাস করলে রোজা ভেঙে যায় এবং কাফফারা দিতে হয়। এক ব্যক্তি নবী ﷺ–এর কাছে এসে বলল, সে স্ত্রীসহ সহবাস করেছে। তখন তাকে দাস মুক্ত করা, অথবা দুই মাস ধারাবাহিক রোজা রাখা, অথবা ষাট জন মিসকিনকে খাদ্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। — সহিহ বুখারি
(৩) ইচ্ছাকৃত বমি
রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত বমি করল, তার কাজা করতে হবে; আর অনিচ্ছাকৃত বমিতে কাজা নেই।” — সুনান আত-তিরমিজি
(৪) হায়েজ বা নিফাস শুরু হওয়া
ঋতুস্রাব শুরু হলে রোজা ভেঙে যায় এবং পরে কাজা করতে হয়।
(৫) রিদ্দাহ (ইসলাম ত্যাগ করা)
ঈমান নষ্ট হলে সকল ইবাদত বাতিল হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন:
“যদি তারা শিরক করে, তবে তাদের সকল আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে।” — আল-কুরআন, সূরা আল-আনআম ৬:৮৮
রোজার আদব ও নৈতিকতা
রোজা শুধু শারীরিক বিরত থাকা নয়; নৈতিক সংযমও জরুরি। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ ত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।” — সহিহ বুখারি
অতএব—
- গীবত
- মিথ্যা
- অশ্লীলতা
—এসব থেকেও বিরত থাকতে হবে।
রোজার শর্ত, রুকন ও ভঙ্গের কারণ জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জরুরি।
রোজা সহিহ হওয়ার জন্য—
✔ সঠিক নিয়ত
✔ নির্ধারিত সময় মেনে চলা
✔ শরীয়তের বিধান জানা
✔ গুনাহ থেকে বিরত থাকা
রোজা কেবল শরীরের অনুশীলন নয়; এটি আত্মার পরিশুদ্ধি ও তাকওয়ার প্রশিক্ষণ। আল্লাহ আমাদেরকে সহিহভাবে রোজা পালন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।